চট্টগ্রামে হার্টের রিং বাণিজ্যের অভিযোগ চিকিৎসক-নার্সের বিরুদ্ধে

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি

সারাদেশ

চট্টগ্রামের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্টেন্ট (হার্টের রিং) ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে একটি অবৈধ বাণিজ্য চক্রের

2026-07-29T08:43:39+00:00
2026-07-29T09:11:05+00:00
 
  বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬,
১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
চট্টগ্রামে হার্টের রিং বাণিজ্যের অভিযোগ চিকিৎসক-নার্সের বিরুদ্ধে
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ৮:৪৩ এএম  আপডেট: ২৯.০৭.২০২৬ ৯:১১ এএম
সংগৃহীত ছবি
চট্টগ্রামের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্টেন্ট (হার্টের রিং) ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে একটি অবৈধ বাণিজ্য চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ভারত থেকে অবৈধ পথে আনা স্টেন্ট, বেলুন ক্যাথেটার ও গাইড ওয়্যারসহ বিভিন্ন চিকিৎসা উপকরণ রোগীদের শরীরে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন রোগীদের জীবন চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই চক্রের সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামের কয়েকটি নামিদামি হাসপাতালের একশ্রেণির অসাধু চিকিৎসক, নার্স ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহকারী জড়িত। রোগীদের প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন রেখে নিম্নমানের বা অনিবন্ধিত পণ্য ব্যবহারেরও অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, ভারত থেকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে আনা হচ্ছে স্টেন্ট, বেলুন ক্যাথেটার, গাইড ক্যাথেটার, গাইড ওয়্যার, ম্যানিফোল্ড, শিথ ও টাইগার ক্যাথেটারের মতো হৃদরোগের বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল ছাড়াও নগরীর বেশ কিছু বেসরকারি হাসপাতালে এই চক্রের প্রভাব রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— পার্কভিউ হাসপাতাল, সিএসসিআর, মেট্রোপলিটন হাসপাতাল, এভারকেয়ার, ম্যাক্স হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল সেন্টার, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল এবং অ্যাপোলো ইমপেরিয়াল হাসপাতাল।

অনুসন্ধানে চক্রটির অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে মাসুদুর রহমানের নাম উঠে এসেছে। তিনি বোস্টন সাইন্টিফিকের সাব-ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি একাধিক প্রতিষ্ঠান খুলে চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবসা পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।


আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি স্টেন্ট ব্যবহারের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী রোগী বা স্বজনদের স্টেন্টের প্যাকেট, ব্র্যান্ড, মান ও অন্যান্য তথ্য জানানোর কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করা হয়।

চমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগ নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। অভিযোগ উঠেছে, হৃদরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম চৌধুরীর ভাতিজা ফায়েজ চৌধুরীর প্রতিষ্ঠান ‘কার্ডিওকিট’-এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হতো। এছাড়া চমেক হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ইকবাল মাহমুদের বিরুদ্ধেও একটি লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অবৈধভাবে আনা স্টেন্ট ও অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

সরকারি একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে চমেক হাসপাতালের ক্যাথল্যাব ব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, চমেক হাসপাতালে তিনটি ক্যাথল্যাব থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে দুটি বন্ধ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ক্যাথল্যাবের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন কয়েকজন সিনিয়র স্টাফ নার্স।

নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানির পণ্য ব্যবহারে চাপ সৃষ্টি এবং প্রতিটি কোম্পানির কাছ থেকে ওটি চার্জ বাবদ ৫ হাজার টাকা করে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্টেন্ট ও অন্যান্য মেডিকেল ডিভাইস নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও কোল্ড চেইন বজায় রেখে সংরক্ষণ করতে হয়। অবৈধ পথে আনা পণ্যের মান ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা যথাযথ না থাকায় এর কার্যকারিতা নষ্ট হতে পারে, যা রোগীর জন্য মারাত্মক জীবনঝুঁকি তৈরি করে।

হার্টের রিং ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে স্বাস্থ্য প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো অসাধু চক্রকে রোগীদের জিম্মি করে অনিয়ম করার সুযোগ দেওয়া হবে না এবং অভিযোগের সত্যতা পেলে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পার্কভিউ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এ টি এম রেজাউল করিম জানান, প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করা হয়েছে এবং বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানান, অভিযোগগুলো যাচাই করে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এভারকেয়ার হাসপাতালের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের পরিচালক ড. আকতার হোসেন বলেন, নিবন্ধনহীন কোনো প্রতিষ্ঠান হৃদরোগের চিকিৎসা উপকরণ বাজারজাত বা সরবরাহ করতে পারবে না।

ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক মোহা. আলমগীর হোসেন জানান, নিবন্ধন ছাড়া কোনো মেডিকেল ডিভাইস আমদানি বা ব্যবহার করার সুযোগ নেই। অবৈধভাবে আনা চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে হাসপাতালগুলোতে অভিযান চালানো হবে।

সময়ের আলো/জোই


  বিষয়:   চট্টগ্রাম  হার্টের রিং  বাণিজ্যে  চিকিৎসক  নার্স  সিন্ডিকেট  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: