বন্ধুত্ব মানেই শুধু সমবয়সি দুজন মানুষের সম্পর্ক নয়। কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে দুই প্রজন্মের মানুষের মধ্যে। মা ও মেয়ের সম্পর্কও তেমনই এক অনন্য বন্ধুত্বের গল্প। যেখানে মা শুধু অভিভাবক নন, হয়ে ওঠেন মেয়ের নির্ভরতার জায়গা; আর মেয়ে শুধু সন্তান নয়, মায়ের একান্ত আপন একজন মানুষ।
শৈশবে মেয়ের কাছে মা মানেই নিরাপত্তা। প্রথম হাঁটা, প্রথম স্কুল, পরীক্ষার ভয়, অসুস্থতার রাত কিংবা ছোট্ট কোনো আবদার, সবকিছুর সঙ্গী মা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেয়ের জীবনে আসে নতুন বন্ধু, নতুন জগৎ, নতুন চিন্তা। তখন মা-মেয়ের সম্পর্কেও আসে পরিবর্তন। এই পরিবর্তন সুন্দরভাবে গ্রহণ করতে পারলে মা হয়ে উঠতে পারেন মেয়ের সবচেয়ে কাছের বন্ধু।
কৈশোরে মেয়েরা নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। মাসিক, শরীরের পরিবর্তন, নিজের চেহারা নিয়ে ভাবনা, বন্ধুত্ব, ভালো লাগা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা- এসব বিষয়ে অনেকেই অস্বস্তি বা সংকোচবোধ করে। এ সময় মায়ের সঙ্গে সহজে কথা বলার সুযোগ থাকলে মেয়ের আত্মবিশ্বাস বাড়ে।
সন্তানের কথা মন দিয়ে শোনা এবং সঙ্গে সঙ্গে বিচার বা সমালোচনা না করা মা-মেয়ের সম্পর্ক অনেক বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ করে তোলে। বিশেষ করে কৈশোরে সন্তান যখন নিজের পরিচয় ও স্বাধীনতার জায়গা তৈরি করতে চায়, তখন মায়ের সহযোগিতামূলক আচরণ তার মানসিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
মা-মেয়ের বন্ধুত্ব মানে সব বিষয়ে একমত হওয়া নয় বরং মতের অমিল থাকলেও একে অন্যের মতামত সম্মান করার মানসিকতা তৈরি করা। ‘আমি মা, তাই আমি সব জানি’ কিংবা ‘তুমি ছোট, তাই তোমার মতামতের মূল্য নেই’- এমন মানসিকতা সম্পর্কের দূরত্ব বাড়াতে পারে।
মা-মেয়ের বন্ধুত্ব অনেক সময় শুধু মেয়ের প্রয়োজনের জায়গা থেকে দেখা হয়। অথচ মায়েরও আবেগ আছে, ক্লান্তি আছে, ভয় আছে, অপূর্ণতা আছে। তারও প্রয়োজন হয় এমন একজন মানুষের, যার কাছে নিজের কথা বলা যায়। একসঙ্গে চা খাওয়া, রান্না করা, কেনাকাটা করা, সিনেমা দেখা কিংবা শুধু গল্প করতে বসা, ছোট ছোট এই সময়গুলোই সম্পর্ক আরও গভীর করে। মেয়ের উচিত শুধু নিজের কথা বলার পাশাপাশি মায়ের কথাও মন দিয়ে শোনা।
মায়ের বেড়ে ওঠার সময় আর মেয়ের বেড়ে ওঠার সময় এক নয়। তাই পোশাক, বন্ধুত্ব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পড়াশোনা, ক্যারিয়ার কিংবা জীবনযাপন নিয়ে মতের অমিল থাকতেই পারে। কিন্তু মতের অমিল দূরত্বে পরিণত না করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রজন্মের ব্যবধান কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো একে অন্যের জগৎটা বোঝার চেষ্টা করা। মা মেয়ের বর্তমান বাস্তবতা বুঝবেন আর মেয়ে মায়ের অভিজ্ঞতা ও মূল্যবোধ সম্মান করবে। এতে সম্পর্কের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা তৈরি হয়।
মা-মেয়ের বন্ধুত্ব আসলে এমন এক সম্পর্ক, যেখানে বয়সের ব্যবধান থাকলেও মনের দূরত্ব থাকে না। একজনের অভিজ্ঞতা আর অন্যজনের স্বপ্ন যখন পাশাপাশি হাঁটে, তখন সেই বন্ধুত্ব হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আশ্রয়।
সময়ের আলো/আআ