উত্তরার আব্দুল্লাহপুর স্লুইস গেটের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় যে কালো, দুর্গন্ধময় পানির প্রবাহটি আমাদের চোখে পড়ে, তার একটা গৌরবময় ইতিহাস আছে। অনেকেই হয়ত জানি না, দিয়াবাড়ি, বাউনিয়া ও আলোকদি হয়ে যে প্রবাহটি একসময় মিরপুরের বিশাল জলাশয় এবং তুরাগ নদে গিয়ে মিশত, সেটি আসলে কোনো সাধারণ ড্রেন বা কৃত্রিম খাল নয়; এর ঐতিহাসিক নাম ছিল ‘কনাই নদ’!
আশির দশকের আগেও এই পুরো অঞ্চলের জলবৈচিত্র ছিল রূপকথার মতো। ১৭৬৫ সালের রেনেলের মানচিত্রের তথ্য অনুযায়ী, কনাই নদের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৭ কিলোমিটার। ১৮৮৮-১৯৪০ সালের সিএস ম্যাপ (ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে) নথিপত্রে এই নদটির দৈর্ঘ্য পাওয়া যায় প্রায় ১২ কিলোমিটার। এছাড়া, সাম্প্রতিক ২০২২ সালের সিএসে খালে রূপান্তর হতে হতে নদটির দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ কিলোমিটারে!
নামে কিংবা বৈশিষ্ট্যে কোনোভাবেই এটিকে আর নদ বলার উপায় নেই। তুরাগ নদী (টঙ্গী খাল) থেকে উৎপন্ন হয়ে এই জীবন্ত নদটি পুরো উত্তর ঢাকাকে সতেজ রাখত। বর্ষাকালে উজানের পানি ধারণ করে মিরপুর-পল্লবীর নিচু জমিকে প্লাবিত ও উর্বর করত। পরবর্তীতে উত্তরা মডেল টাউন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ তৈরি করার সময় টঙ্গী নদীর প্রবেশমুখে নির্মাণ করা হয় ‘আব্দুল্লাহপুর স্লুইস গেট’। এরপর থেকেই নদটি তার স্বাভাবিক গতি হারিয়ে মানচিত্রে ‘খিদির খাল’ বা ‘রাজউক খাল’ নামে পরিচিত হয়।
গত ৪ দশকে উত্তরার আবাসিক নগরায়ণ, দিয়াবাড়ি-মিরপুরের ভেতরের নিচু জমি ভরাট এবং চারপাশের দখলদারিত্বের কারণে নদটি আজ মৃতপ্রায়। উত্তরা ও আশেপাশের এলাকার গৃহস্থালির বর্জ্য এবং স্যুয়ারেজ লাইনের পানি পড়ে এটি এখন মশার প্রজনন কেন্দ্র ও একপ্রকার ড্রেনে পরিণত হয়েছে। একইসঙ্গে প্রবাহটি আজ খণ্ডবিখণ্ড।
আশার কথা হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে এখানে কিছু খনন কাজ করেছে এবং একে ‘ব্লু নেটওয়ার্ক’ প্রকল্পের আওতায় এনে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা চলছে। আমাদের চারপাশের পরিবেশকে বাঁচাতে হলে এই ঐতিহাসিক জলপথগুলোকে ফিরিয়ে আনা বড্ড প্রয়োজন। কর্তৃপক্ষ তো তাদের কাজ করবেই, কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমাদেরও উচিত সচেতন হওয়া, খালে ময়লা আবর্জনা ফেলা বন্ধ করা। কোনো না কোনোভাবে হারানো ‘কনাই নদ’কে আবার আগের রূপে ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি।
সময়ের আলো/মহু