উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় দীর্ঘদিন ধরে চলা জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ নদী ও খালের অবৈধ দখল। প্রতি বর্ষায় সামান্য বৃষ্টিতেই শহর থেকে গ্রাম— বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। বছরের পর বছর কপোতাক্ষ, ইছামতী ও বেতনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নদী ও নৌ-খালের জমি দখল করে গড়ে উঠেছে ইটভাটা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, মাছের ঘের, কৃষিজমি, পুকুর ও বসতবাড়ি। এতে পানি চলাচলের স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবার অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযানে নামছে জেলা প্রশাসন। ইতোমধ্যে কপোতাক্ষ, ইছামতী, বেতনা নদী এবং জেলার বিভিন্ন খালের ৩০২ জন অবৈধ দখলদারের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। একইসঙ্গে উচ্ছেদ অভিযানের জন্য বিশেষ কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের নির্দেশনায় সহকারী কমিশনারদের (ভূমি) মাধ্যমে সরেজমিন তদন্ত, জমির রেকর্ড যাচাই ও পুনঃতদন্ত শেষে তালিকাটি চূড়ান্ত করা হয়। পরবর্তীতে এটি জেলা প্রশাসনের দাফতরিক ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
সদর উপজেলার বাবুলিয়া মৌজায় বেতনা নদীর প্রায় ২ বিঘা ৮ কাঠা জমি দখল করে ‘কামরুল এসবিবি’ ও ‘মনির এসবিএল’ নামে দুটি ইটভাটা পরিচালনা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, বিনেরপোতা এলাকায় বেতনা নদীর তীরে নির্মাণাধীন ‘হাসান ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড’-এর বিরুদ্ধে প্রায় ১ দশমিক ১৮৭ বিঘা জমি দখলের তথ্য উঠে এসেছে তালিকায়, যেখানে সীমানা প্রাচীর ও অবকাঠামোও নির্মাণ করা হয়েছে।
সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরকারি নৌ-খাল দখল করে মাছের ঘের, ধান চাষ এবং স্থায়ী-অস্থায়ী স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। এতে অনেক খালের অস্তিত্বই এখন বিলীন প্রায়।
তালা উপজেলার মাগুরা, জগদানন্দকাটি, পুটিয়াখালী, রাজেন্দ্রপুর ও জালালপুর মৌজায় কপোতাক্ষ নদীর জমি দখল করে শতাধিক ব্যক্তি বসতবাড়ি, পুকুর ও কৃষিজমি তৈরি করেছেন।
জেলা প্রশাসনের তৈরি কর্মপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, বর্ষা মৌসুমেই নদীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ উদ্ধার করতে ৫০ দিনের বিশেষ (ক্র্যাশ) অভিযান পরিচালনা করা হবে। পর্যায়ক্রমে সব অবৈধ দখল উচ্ছেদের পাশাপাশি পানি চলাচলের প্রতিবন্ধকতা দূর করা হবে।
তবে এই অভিযান সফল করতে পর্যাপ্ত জনবল, লজিস্টিক সহায়তা এবং নদীসীমানায় বসবাসকারী ভূমিহীন পরিবারগুলোর পুনর্বাসনকে মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে শহরের বাইপাস সড়ক-সংলগ্ন একটি খাল থেকে অবৈধ নেট-পাটা অপসারণের মাধ্যমে কাজ শুরু হয়েছে।
সমাজসেবক ডা. আবুল কালাম বাবলা বলেন, সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় সংকট এখন জলাবদ্ধতা। ব্যক্তিস্বার্থে যারা খাল-নদী দখল করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
সনাক সভাপতি তৈয়ব হাসান সামছুজ্জামান বাবু বলেন, অভিযান যেন কেবল ছোট দখলদারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, প্রভাবশালী দখলদারদের বিরুদ্ধেও সমভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে।
জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ বলেন, পানি চলাচলের পথ পরিষ্কারের কাজ চলমান। নতুন করে কেউ দখল করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সব বড় অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করে ধারাবাহিকভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে।
পূর্বে একাধিকবার নদী দখলের তালিকা প্রকাশ ও উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও প্রভাবশালী দখলদারদের ছাড় দেওয়ার অভিযোগ ছিল। ফলে ৩০২ জন দখলদারের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর এ অভিযান কপোতাক্ষ, ইছামতী ও বেতনাকে সত্যি কতটা মুক্ত করতে পারে, এখন সেদিকেই চেয়ে আছেন জলাবদ্ধতায় জর্জরিত সাতক্ষীরাবাসী।
সময়ের আলো/জোই