একসময় একা ভ্রমণ করা নারীদের জন্য অনেকটাই অস্বাভাবিক বলে মনে করা হতো। সমাজের নানা রকম দৃষ্টিভঙ্গি, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং পারিবারিক বিধিনিষেধ নারীদের চলার পথকে সীমিত করে রেখেছিল। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন দেশের ভেতরে কিংবা দেশের বাইরে অসংখ্য নারী একাই ভ্রমণ করছেন, নতুন সংস্কৃতি জানছেন, নিজের সক্ষমতাকে আবিষ্কার করছেন এবং আত্মবিশ্বাসের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছেন। তবে স্বাধীনভাবে ভ্রমণের এই সুযোগের পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনতা, পরিকল্পনা এবং কিছু প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চললে নারীদের একক ভ্রমণ হতে পারে নিরাপদ ও আনন্দময়।
দেশের ভেতরে কতটা নিরাপদ
বাংলাদেশে নারীদের একা ভ্রমণের প্রবণতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। কক্সবাজার, সিলেট, সাজেক, বান্দরবান, সুন্দরবন কিংবা সেন্টমার্টিনসহ সব জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে এখন নিয়মিত নারী ভ্রমণকারীদের দেখা যায়। অনেক হোটেল ও রিসোর্ট নারী অতিথিদের জন্য আলাদা নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সহায়তা দিয়ে থাকে।
তবে নিরাপদ ভ্রমণের জন্য কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। সম্ভব হলে দিনের আলোতে যাতায়াত করা, নির্ভরযোগ্য পরিবহন ব্যবহার করা, আগে থেকেই হোটেল বুকিং নিশ্চিত করা এবং পরিবারের সদস্য বা ঘনিষ্ঠ কাউকে নিজের অবস্থান সম্পর্কে জানিয়ে রাখা উচিত। অচেনা মানুষের সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার না করাও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশে একা ভ্রমণ কতটা নিরাপদ
বর্তমান বিশ্বের অনেক দেশ একক নারী ভ্রমণকারীদের জন্য বেশ নিরাপদ হিসেবে পরিচিত। নেপাল, ভুটান, জাপান, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড কিংবা কানাডার মতো দেশে আইনশৃঙ্খলা, গণপরিবহন এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনা তুলনামূলকভাবে উন্নত। এসব দেশে প্রতিদিন হাজারো নারী একাই ভ্রমণ করেন এবং নিরাপদে বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখেন।
ভ্রমণকন্যা জেরিন রওনক সূচী বলেন, ‘ফ্যামিলি ছাড়া একা ঘুরতে গেলে মজাই আলাদা। কিন্তু একটা সুন্দর জায়গা দেখলে ফ্যামিলি মেম্বারদের মিস করি। এখন পর্যন্ত দেশের বাইরে আমি সেইফলি ঘুরতে পারছি, আমি বা আমার সঙ্গে কোনো মেয়ে ফ্রেন্ড বা মেয়ে পার্টনার ঘুরতে গিয়ে কোনো বাজে বা তিক্ত অভিজ্ঞতায় পড়িনি। তবে পরিবার ছাড়া একা ঘুরে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তা হলো আমি অনেক বেশি দায়িত্বশীল হয়েছি। আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমে গেছে।’
প্রস্তুতিই সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা
একটি সফল ভ্রমণের মূল চাবিকাঠি হলো ভালো প্রস্তুতি। যাত্রার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কপি আলাদা করে রাখা, পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ডিজিটাল কপি সংরক্ষণ করা এবং জরুরি ফোন নম্বর হাতের কাছে রাখা উচিত।
মোবাইল ফোন সবসময় চার্জে রাখা, পাওয়ার ব্যাংক সঙ্গে রাখা এবং লোকেশন শেয়ারিং সুবিধা ব্যবহার করলে প্রয়োজনে দ্রুত সহায়তা পাওয়া সম্ভব। ভ্রমণের সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত নগদ অর্থ বহন না করে কার্ড বা নিরাপদ ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করা ভালো। মূল্যবান গহনা বা দামি জিনিসপত্র প্রকাশ্যে প্রদর্শন না করাও নিরাপত্তা বাড়ায়।
আত্মবিশ্বাস ও আত্মরক্ষার গুরুত্ব
নিরাপদ ভ্রমণের অন্যতম শক্তি হলো আত্মবিশ্বাস। আত্মবিশ্বাসী আচরণ অনেক অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি এড়াতে সাহায্য করে। প্রয়োজন হলে দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলতে জানা, সন্দেহজনক পরিস্থিতি দ্রুত বুঝে স্থান ত্যাগ করা এবং প্রয়োজনে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি থাকা জরুরি।
স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও জরুরি
একা ভ্রমণ মানেই ভয় নয়, বরং দায়িত্বশীল স্বাধীনতা। নারীরা আজ কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা, গবেষণা কিংবা অবকাশ যাপনসহ সব ক্ষেত্রেই বিশ্বের
নানা প্রান্তে একা ভ্রমণ করছেন। তাদের এই যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত আনন্দের নয়, বরং সমাজে নারীর সক্ষমতা ও আত্মনির্ভরতার একটি শক্তিশালী বার্তাও বহন করে। দেশে হোক বা বিদেশে, ঝুঁকি যেমন আছে, তেমনি নিরাপদভাবে ঘুরে দেখার অসংখ্য সুযোগও রয়েছে। প্রয়োজন শুধু তথ্যভিত্তিক প্রস্তুতি, আত্মবিশ্বাস এবং দায়িত্বশীল আচরণ। তা হলেই প্রতিটি ভ্রমণ হয়ে উঠতে পারে নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন শিক্ষা এবং নিজের সীমাকে আরও বিস্তৃত করে দেখার এক অনন্য সুযোগ।
সময়ের আলো/আআ