ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস হলো, যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে জীবন কাটিয়েছে এবং সৎকর্ম করেছে, আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, অচিরেই তাদেরকে আমি এমন জান্নাতে প্রবেশ করাব, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। সেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে। এটি আল্লাহর সত্য প্রতিশ্রুতি। আর কথায় আল্লাহর চেয়ে অধিক সত্যবাদী কে?’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১২২)।
অতএব, সাধারণভাবে বলা যায়—প্রত্যেক প্রকৃত মুমিন ও সৎকর্মশীল ব্যক্তি জান্নাত লাভ করবে।
তবে এই সাধারণ বিধানকে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না যে, ‘অমুক ব্যক্তি অবশ্যই জান্নাতি।’ কারণ একজন মানুষের জীবনের শেষ পরিণতি কী হবে, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন।
ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির জান্নাতি হওয়ার সাক্ষ্য কেবল তিন ক্ষেত্রে দেওয়া যায়—
১. আল্লাহ তায়ালা যার জান্নাতি হওয়ার সংবাদ দিয়েছেন।
২. নবীজি (সা.) যার জান্নাতি হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন।
৩. যার ব্যাপারে সমগ্র উম্মাহর ইজমা (সর্বসম্মত ঐকমত্য) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এর অন্যতম উদাহরণ হজরত আবু বকর (রা.)। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আর এ আগুন থেকে দূরে রাখা হবে সেই সর্বাধিক মুত্তাকি ব্যক্তিকে, যে নিজের সম্পদ ব্যয় করে আত্মশুদ্ধি অর্জন করে। কারো অনুগ্রহের প্রতিদান দেওয়ার জন্য নয়; বরং কেবল তার মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে। অচিরেই সে সন্তুষ্ট হবে।’ (সুরা লাইল, আয়াত : ১৭-২১)
তাফসিরবিদদের একটি বড় অংশের মতে, এ আয়াতগুলো হজরত আবু বকর (রা.)-কে উদ্দেশ্য করেই নাজিল হয়েছে। তাই এটি তাঁর জান্নাতি হওয়ার অন্যতম দলিল।
নবীজি (সা.) যাদের জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন
নবীজি (সা.) বহু সাহাবিকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আশারায়ে মুবাশশারা—অর্থাৎ জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ সাহাবি—বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া মহানবী (সা.)-এর সম্মানিত স্ত্রীগণও জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।
কিছু নেককার ব্যক্তির ব্যাপারে যুগে যুগে মুসলিম উম্মাহ একমত হয়েছে। এ বিষয়ে নবীজি (সা.)-এর একটি হাদিস প্রমাণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য।
একবার তাঁর সামনে একটি জানাজা অতিক্রম করল। উপস্থিত লোকেরা মৃত ব্যক্তির প্রশংসা করলেন। তখন তিনি বললেন, ‘ওয়াজাবাত’—অর্থাৎ তার জন্য জান্নাত অবধারিত হয়েছে।
এরপর আরেকটি জানাজা এলো। লোকেরা মৃত ব্যক্তির নিন্দা করলেন। তখনও তিনি বললেন, ‘ওয়াজাবাত।’
সাহাবিরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রথম ব্যক্তির ব্যাপারে তোমরা ভালো সাক্ষ্য দিয়েছ, তাই তার জন্য জান্নাত অবধারিত হয়েছে। আর দ্বিতীয় ব্যক্তির ব্যাপারে মন্দ সাক্ষ্য দিয়েছ, তাই তার জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়েছে। তোমরাই পৃথিবীতে আল্লাহর সাক্ষী।’
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৩৬৮)
কেন নির্দিষ্ট করে কাউকে জান্নাতি বলা যায় না?
কোনো ব্যক্তির বাহ্যিক জীবন ঈমান ও নেক আমলে পরিপূর্ণ মনে হলেও তার শেষ পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। তাই আমরা সাধারণভাবে বলি, ‘যে ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, সে জান্নাতে যাবে।’ কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে বলি না, ‘তিনি অবশ্যই জান্নাতি।’
এর বাস্তব উদাহরণ রয়েছে একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে। এক যুদ্ধে এক সাহাবি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন। তাঁকে দেখে সবার ধারণা হয়েছিল, তিনি অবশ্যই জান্নাতি। কিন্তু নবীজি (সা.) বললেন, ‘সে জাহান্নামিদের অন্তর্ভুক্ত।’
এ কথা শুনে সাহাবারা বিস্মিত হন। পরে দেখা গেল, যুদ্ধে আহত হয়ে তিনি ধৈর্য হারিয়ে আত্মহত্যা করেন। তখন নবীজি (সা.) বললেন, ‘কোনো ব্যক্তি মানুষের দৃষ্টিতে জান্নাতবাসীদের মতো আমল করতে থাকে, অথচ সে প্রকৃতপক্ষে জাহান্নামবাসীদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৮৯৮)।
ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়—মানুষের চূড়ান্ত পরিণতির ফয়সালা একমাত্র আল্লাহ তাআলার হাতে। তাই আমরা কারও ঈমান ও নেক আমল দেখে তার জন্য কল্যাণের আশা করতে পারি, তার জন্য দোয়া করতে পারি; কিন্তু আল্লাহ, তাঁর রাসুল (সা.) অথবা উম্মাহর সর্বসম্মত সাক্ষ্য ছাড়া কাউকে নিশ্চিতভাবে জান্নাতি বলা উচিত নয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ঈমানের ওপর অটল রাখুন, উত্তম পরিণতি দান করুন এবং জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন। আমিন।
সময়ের আলো/এসএকে