চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মসজিদের পেশ ইমাম মিজানুর রহমানকে (৫৫) গ্রেফতারের পর পুলিশ হেফাজতে রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ভোরে গ্রেফতারের পর থানায় নেওয়ার পথে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। আশঙ্কাজনক অবস্থা দেখে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত মিজানুর রহমান রূপসা উত্তর ইউনিয়নের মজুমদার বাড়ির মৃত শরাফত আলী মাস্টারের ছেলে। তিনি কড়ইতলী পাটওয়ারী বাড়ির বাইতুল হামদ জামে মসজিদের পেশ ইমাম ও রওশনআরা নূরানী হাফেজিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন। গত প্রায় দুই দশক ধরে তিনি শ্বশুরবাড়ি কড়ৈতলী বাবুর দিঘীরপাড় এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করছিলে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রোববার (২৬ জুলাই) সকালে কড়ইতলী গ্রামে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে। ঘটনায় শিশুটির বাবা মো. নূরুল ইসলাম খান বৃহস্পতিবার ভোররাত ৪টার দিকে ফরিদগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগ পেয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ এরশাদ উল্ল্যাহর নির্দেশে এসআই নুরুল আলম সঙ্গীয় ফোর্সসহ অভিযুক্তের বাড়িতে অভিযান চালায়। বসতঘর থেকে মিজানুরকে গ্রেফতার করে থানায় নেওয়ার পথে গাজীপুর বাজার এলাকায় পৌঁছালে তিনি তীব্র অসুস্থতা বোধ করেন। দ্রুত তাকে ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. মাকছুদুল হাছান জানান, ভোর ৫টা ৫৫ মিনিটে পুলিশ মিজানুর রহমানকে সংকটাপন্ন (কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট) অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসে। তাকে তাৎক্ষণিক অক্সিজেন প্রদান ও ইসিজি করার ব্যবস্থা করা হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই তিনি মারা যান। শরীরে কোন আঘাতের চিহ্ন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে কোনো দৃশ্যমান জখম পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েই তার মৃত্যু হয়েছে।
অন্যদিকে, ঘটনাটিকে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ও মানসিক নির্যাতন বলে দাবি করেছে নিহতের পরিবার। নিহতের শ্যালক ও স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য আলী হায়দার উজ্জ্বল বলেন, একটি মিথ্যা অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আসিফ ভূঁইয়া ও তার সহযোগীরা ফেসবুকে লাইভ করে আমার বোনজামাইয়ের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিল। চাঁদা না পেয়ে তাদের যোগসাজশেই কোনো তদন্ত ছাড়াই পুলিশ তাকে তড়িঘড়ি করে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের সময় তিনি ঘরে ফজরের নামাজটুকু আদায়ের আকুতি জানিয়েছিলেন, কিন্তু পুলিশ তাকে সেই সুযোগও দেয়নি।
তিনি আরও দাবি করেন, নিহতের শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে এবং এই অপবাদ ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তার মৃত্যু হয়েছে। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার দাবি করছেন।
গ্রেফতারকারী এসআই মোহাম্মদ নুরুল আলম জানান, মামলা রেকর্ড হওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। পথিমধ্যে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাই।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) লুৎফর রহমান জানান, আসামি গ্রেফতারের পর থানায় নেওয়ার পথে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। মৃত্যুর সঠিক ও প্রকৃত কারণ বের করতে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির জন্য হাসপাতালে উপস্থিত হন চাঁদপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার তানবীর রাব্বি। তিনি উপস্থিত পুলিশসহ মরদেহের সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানান।
সময়ের আলো/আতা