প্রকৃতিই বাংলা সাহিত্যের বড় অংশ নির্মাণ করেছে। বাংলা কবিতায় ঋতুর মহিমা চিত্রিত হয়েছে চিরকাল, এখনও হচ্ছে। আর হবেই বা না কেন, আমাদের দেশের যে ঋতুবৈচিত্র্য, তা ধারণ করেই এগিয়ে গেছে কবিতা-শিল্পকলা। সেই কবেকার কালীদাস বা রবীন্দ্রনাথই শুধু নয়, আজকের তরুণ কবিও বর্ষায় ভিজতে ভিজতে বাড়ি ফেরে। হয়তো তার লেখার খাতাতেও মেঘজল জমে যায়। অবশ্য এখন আর খাতায় কেউ লেখে না, লেখে মনিটরে। মনিটর কি শ্রাবণ মাসে ভেজে? মেঘমেদুর বরিষন কি মনিটরে ধরা যায়? যাবে না কেন? অর্থাৎ বাংলা কবিতায় বর্ষা এখন দখলদারিত্ব কায়েম করেছে। কবির মাথার মধ্যে রাশি রাশি মেঘ জমে থাকে, সেই মেঘই বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে কবিতায়। শুধু কবিতা কি ধরেছে শ্রাবণ দিনের মেঘকে? বাংলা গান, গানের তালে নাচ, নাচের তালে মানুষের মন- ঝরঝর শব্দে উঠে আসে।
এহেনু বর্ষা আকস্মিত বন্যা ও প্লাবণ ডেকে আনে। জনজীবন বিপর্যস্ত হয় বৈ কী। ফসলি মাঠের যেমন ক্ষতি হয়, বন্যার পর মাঠে পলি পড়ে, সেই পলিতে পুনরায় ফসল ফলে। একটা ভারসাম্য হয়তো প্রকৃতিই গড়ে দেয়। এভাবেই যুগের পর যুগ চলে আসছে।
মনে হয় যে, বর্ষার অঝোর ধারায় বা শ্রাবণ জলে গান ভেসে যাচ্ছে। সেই গানের ভেতর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে জনপদের দুঃখী মানুষের দুঃখ, শোক, শূন্যতায় মর্মগাথা। সেসব দুঃখের কথা, গহন-মগ্ন দীর্ঘশ্বাসের ধাক্কা উঠে আসে কবিতার পঙ্ক্তিতে। নাগরিক পাঠকের মনেও কি সেই দীর্ঘশ্বাস ধাক্কা দিতে পারে?
এমনিতেই এই দেশ নদীদের দেশ। নদীপাড়ের মানুষের ঘরবাড়ির দেশ। হাওড়ের দেশ, বিল-বাঁওড়ের দেশ। আর সব নদী গিয়ে মেশে দক্ষিণে, সমুদ্রে। এই দেশ সমুদ্রেরও দেশ। অর্থাৎ জল ছাড়া জীবন পূর্ণ নয় এখানে। তাই জলের কবিতা, জলের দুঃখ, জলের অশ্রু অতি সহজলভ্য এখানে। ঘটা করে বৃষ্টি বর্ষা-শ্রাবণকে মহিমান্বিত করি আমরা। কেননা জল এখানে জীবনের সমার্থক। আমরা তো মরু এলাকার মানুষ না, আবার বরফ-শীতল মেরুও নয় আমাদের জমিন, আমরা সেই আদিকাল থেকেই নদীমাতৃক জনপদের মানুষ। সে হিসেবেই আমাদের মনোজগৎ গড়ে উঠেছে, সংবেদন গড়ে উঠেছে। আমাদের শিল্প-সাহিত্যেও সেই সংবেদন জায়গা করে নিয়েছে।
শুধু ক্ষুধায় অভাবের কারণে, ব্যক্তি চরিত্রে অস্থিরতার কারণে আমাদের সাধারণ মানুষের কাছে এখনও সামগ্রিকভাবে পৌঁছুল না নাগরিক জীবনের শিল্পকলা। এর হয়তো কারণ হতে পারে আমাদের ঔপনিবেশিক শিক্ষাকাঠামো। বহিরাগত তত্ত্বকাঠামো। তাই বর্ষা-বৃষ্টি-ঝড় বাদল নিয়ে লেখা কবিতায় পৌঁছুয় না বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে। একটা দূরত্ব আজও থেকেই গেল নাগরিক শহরমুখী জীবনের সঙ্গে সেই নদীপাড়ের সাধারণ মানুষের জীবনের।
এ রকম গ্রাম ও শহরের দূরত্ব কি পৃথিবীর সব দেশেই থাকে? আমি ঠিক জানি না, গ্রাম ও শহরের মানুষের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষাব্যবস্থা, সংস্কৃতিচর্চার ব্যবস্থা গ্রাম ও শহরের দূরত্ব বজায় রেখে একটি দেশ কতদূর যাবে? যেখানে আশিরভাগ মানুষই গ্রামবাসী, তাদের সঙ্গে শহরের মানুষের দূরত্ব কাঠামো আদতে আমাদের একটি সামগ্রিক শক্ত ব্যবস্থা সৃষ্টিতে বাধা হয়েই থাকবে। নাকি একদিন এই বোধ উপলব্ধি হবে কর্তৃপক্ষের যে এই দূরত্ব ঘোচাতে হবে।
হ্যাঁ এই দূরত্ব একদিন না একদিন ঘোচাতে হবেই। কেননা দেশের সামগ্রিক মানব-উন্নয়ন না হলে একটি কবিতা পৌঁছুবে তিনশ পাঠকের কাছে, অথচ মানুষ এখানে বিশ কোটি। তার মধ্যে সতেরো কোটিই গ্রামবাসী। সেই নদীপাড়ের মানুষ তারা। তাদের দুঃখের কথা শহর জানে না, শহরের গোপন ব্যথা গ্রাম জানে না।
এভাবে হয় না। সম্মিলন চাই গ্রাম ও শহরের। প্রথমে যে কথা দিয়ে সূচনা করেছি, সেই কথা কি ছিল নদীদের কথা? নদীপাড়ের জনপদের দিন ও রাত্রির ভাষার সঙ্গে এক ধরনের ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামোতে গড়ে ওঠা শহরের ভাষার দূরত্বের কথা, এই দূরত্ব কবে ঘুচবে জানি না, তবে ঘোচাতে হবেই। তখন সেই অনাগত দিনে না হয় আমরা গাইব শ্রাবণের গান- জলভরা মেঘের কবিতা... ।
সময়ের আলো/আআ