তেঁতুল পাতায় ভূতের নাচ

গাজী তারেক আজিজ

সাহিত্য

একদিন বৃহস্পতিবার। আকাশে খাঁ খাঁ রোদ। স্কুল ছুটি হয়ে গেছে দুপুরেই। রাতুল আর রিমুল বইয়ের ব্যাগ কাঁধে বাড়ির পথে হাঁটছিল।তাদের

2026-09-12T10:42:43+00:00
2026-09-12T10:42:43+00:00
 
  শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৮ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সাহিত্য
তেঁতুল পাতায় ভূতের নাচ
গাজী তারেক আজিজ
প্রকাশ: শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৪২ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
একদিন বৃহস্পতিবার। আকাশে খাঁ খাঁ রোদ। স্কুল ছুটি হয়ে গেছে দুপুরেই। রাতুল আর রিমুল বইয়ের ব্যাগ কাঁধে বাড়ির পথে হাঁটছিল।

তাদের বাড়ি আর স্কুলের মাঝখানে একটি বিরাট বিরান মাঠ। মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল তেঁতুলগাছ। গাছটি এত পুরোনো যে গ্রামের বয়স্ক লোকরাও এর বয়স ঠিক করে বলতে পারেন না। আশ্চর্যের বিষয়, গাছটির আশপাশে আর কোনো গাছ নেই।

রোদেলা দিনে এই পথ দিয়েই দ্রুত বাড়ি ফেরা যায়। তবে বর্ষাকালে মাঠ কাদায় ভরে গেলে তাদের ঘুরে যেতে হয়।
তাদের গ্রামের নাম তেঁতুলতলা। গ্রামের স্কুলটির নামও তেঁতুলতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্কুলটি সরকারি হলেও নামের কোথাও ‘সরকারি’ শব্দটি নেই।

এ নিয়ে গ্রামে নানা গল্প প্রচলিত আছে। 

অনেকে বলে, রাতে স্কুলের ভেতর থেকে চিঁচিঁ শব্দ শোনা যায়। তাই গ্রামের লোকজনের ধারণা— দিনে গ্রামের ছেলেমেয়েরা স্কুলে পড়াশোনা করে, আর রাতে সেখানে ভূতের বাচ্চারা ক্লাস করতে আসে!

আরও মজার গল্প আছে স্কুলের ‘সরকারি’ পরিচয় নিয়ে।

গ্রামের মানুষ অনেক চেষ্টা করে স্কুলটি সরকারি করেছিল। এরপর স্কুলের গায়ে বড় করে লেখা হলো—‘সরকারি তেঁতুলতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়’। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা গেল, অদ্ভুতভাবে শুধু ‘সরকারি’ শব্দটি উধাও!
আবার লেখা হলো। পরদিন সেটিও নেই।

তখন নাকি রাতে কেউ কেউ স্কুলের দিক থেকে ভৌতিক কণ্ঠে শুনেছিল, আমাদের মধ্যে কোনো সরকার নেই। আমরা নিজেদের নিয়মে চলি। তারপর থেকে স্কুলের নাম শুধু তেঁতুলতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেদিন বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ রাতুল থমকে দাঁড়াল।

কী হলো? রিমুল কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে পেছনে তাকাল।

রাতুল কোনো উত্তর দিল না। সে চোখের চশমা খুলে আবার পরল। তারপর তেঁতুলগাছের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে বলল, রিমুল, দাঁড়া! ওদিকে দেখ! কী?

তেঁতুল পাতার ওপর!
রিমুল কিছুই দেখতে পেল না।

রাতুল চশমা খুলে রিমুলের হাতে দিয়ে বলল, এই চশমা দিয়ে দেখ। রিমুল চশমা চোখে দিতেই তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। আ...আ...! তারপরই ধপ করে মাটিতে পড়ে গেল সে। রাতুল হতভম্ব!

চশমা ছাড়া সে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। হামাগুড়ি দিয়ে অনেক খোঁজাখুঁজির পর রিমুলকে পাওয়া গেল। তার চোখে তখনও রাতুলের চশমা। রাতুল চশমাটি নিয়ে চোখে দিতেই তার বুক কেঁপে উঠল।

তেঁতুলগাছের প্রতিটি পাতায় ছোট ছোট অদ্ভুভদ্ভত চেহারার ভূত! কেউ লাফাচ্ছে, কেউ হাত-পা নাড়ছে, কেউ আবার পাতার ওপর গোল হয়ে নাচছে। আর কয়েকটি ভূতের বাচ্চা রিমুলের শরীরের ওপর উঠে নাচানাচি করছে!

রাতুল এবার আরও ভয় পেল। হঠাৎ তার চোখ গেল গাছের ওপর। সেখানে যেন একটি বিশাল ভবন!

ভবনের গায়ে লেখা— ‘ভূতের স্কুল’। ভবনটি দেখতে হুবহু তাদের তেঁতুলতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো।
রাতুলের মাথায় তখন হাজার প্রশ্ন।

তা হলে কি সত্যিই বৃহস্পতিবার দুপুরের পর ভূতের স্কুল বসে? তা হলে কি স্কুলের সেই চিঁচিঁ শব্দ ভূতের বাচ্চাদের? ঠিক তখনই চিঁচিঁ শব্দ আরও জোরে শোনা গেল। রাতুল তাকিয়ে দেখল, গাছের প্রতিটি পাতায় ভূতের বাচ্চারা অদ্ভুত ভঙিতে নাচছে। রাতুলের মনে হলো, আজ বুঝি তাদের কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান!

কিন্তু রিমুল তো এখনও অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে।
রাতুল কী করবে বুঝতে পারছিল না।

ঠিক তখনই স্কুলের নৈশপ্রহরী মোতালেব মিয়া ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সন্ধ্যার আগেই তাকে স্কুলে ডিউটিতে পৌঁছাতে হয়। রাতুলকে একা বসে থাকতে দেখে তিনি জিগ্যেস করলেন, এই সময় এখানে বসে আছিস কেন?


রাতুল কাঁপা গলায় সব ঘটনা খুলে বলল। মোতালেব মিয়া রিমুলকে দেখে বললেন, আচ্ছা, আগে ছেলেটাকে বাড়ি পৌঁছে দিই। তিনি ঘুমন্ত রিমুলকে কাঁধে তুলে নিলেন। রাতুল পেছন পেছন হাঁটতে লাগল। পরদিন স্কুলে রাতুল যখন সব ঘটনা বলল, বন্ধুরা হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগল। তেঁতুল পাতায় ভূতের নাচ! হা হা হা! তবে তাদের বন্ধু রূপম একটুও হাসল না। সে ভয়ে বলল, আমি কিন্তু ওই গাছের কাছে যাব না।

কিন্তু অন্যদের কৌতূহল বেড়ে গেল। সুমন ও আরও পাঁচ বন্ধু ঠিক করল, তারা নিজের চোখে ভূতের নাচ দেখবে। এরপর তারা বৃহস্পতিবারের অপেক্ষায় থাকল। এক বৃহস্পতিবার তারা তেঁতুলগাছের কাছে গেল। কিছুই হলো না। পরের বৃহস্পতিবারও গেল। কিছুই নেই। এভাবে কয়েক বৃহস্পতিবার কেটে গেল। ভূতের দেখা নেই, নাচও নেই। শেষে তারা রাতুলের কাছে গিয়ে জানতে চাইল, তুই কি নিশ্চিত ভূত দেখেছিলি?

রাতুল বলল, নিশ্চিত! তবে একটা কথা পরে জেনেছি। কী? ভূতরা নাকি রাতে স্কুলে ক্লাস করলেও তাদের নাচের অনুষ্ঠান হয় বছরে মাত্র একবার! সুমন হতাশ হয়ে বলল, তা হলে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে পুরো এক বছর? রূপম সঙ্গে সঙ্গে বলল, তোমরা অপেক্ষা কর। আমি এক বছরও না, এক মিনিটও ওই গাছের কাছে যাব না। সবাই হেসে উঠল। তবে রাতুল আর রিমুলের সেই দিনের রহস্য আজও তেঁতুলতলা গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ফেরে। আর বৃহস্পতিবার দুপুরের পর কেউ যদি তেঁতুল গাছের পাতাগুলোকে অদ্ভুতভাবে দুলতে দেখে, সে একটু থেমে যায়।

কারণ কে জানে— হয়তো পাতার আড়ালে তখন আবার শুরু হয়েছে ভূতের বাচ্চাদের বার্ষিক নাচের অনুষ্ঠান!


সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে
  বিষয়:   তেঁতুল  পাতা  ভূত  নাচ 


Advertisement
Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: