মায়ের আঁচল

ফারুক আহম্মেদ জীবন

সাহিত্য

আট বছরের নয়ন আর পাঁচ বছরের মণিকে নিয়ে রেদোয়ান ও মমতার ছোট্ট সংসার। অর্থ-সম্পদ তেমন কিছুই ছিল না তাদের। বাড্ডার

2026-09-05T09:48:49+00:00
2026-09-05T09:48:49+00:00
 
  শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২১ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সাহিত্য
মায়ের আঁচল
ফারুক আহম্মেদ জীবন
প্রকাশ: শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৪৮ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
আট বছরের নয়ন আর পাঁচ বছরের মণিকে নিয়ে রেদোয়ান ও মমতার ছোট্ট সংসার। অর্থ-সম্পদ তেমন কিছুই ছিল না তাদের। বাড্ডার একটি ছোট ভাড়া বাসায় কোনো রকমে দিন কাটত। কিন্তু ভালোবাসার কোনো অভাব ছিল না। সেই ভালোবাসাতেই যেন ভরে থাকত তাদের ছোট্ট ঘরটি।

রেদোয়ান একটি প্রতিষ্ঠানে দারোয়ানের চাকরি করত। বেতন ছিল সামান্য। তবু সেই টাকায় সংসার চালানোর পাশাপাশি দুই সন্তানকে লেখাপড়া করাত। কখনো একটু কষ্ট হতো, কখনো খাবারের তালিকা ছোট করতে হতো; কিন্তু সন্তানদের পড়াশোনার ব্যাপারে রেদোয়ান ও মমতা কোনো আপস করত না।

Advertisement
নয়ন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। আর মণি পড়ে শিশু শ্রেণিতে। দুজনের হাসিমাখা মুখ দেখলেই রেদোয়ানের সারা দিনের ক্লান্তি মুহূর্তে দূর হয়ে যেত। মমতাও ভুলে যেত সংসারের অভাব-অনটন ও সারা দিনের পরিশ্রমের কথা।

একদিন কাজ শেষে রেদোয়ান বাসায় ফিরল। হাতে ছিল কয়েকটি পাকা কলা, ডিম ও কিছু মাছ-তরকারি। বাবাকে দেখেই নয়ন ও মণি দৌড়ে গেল।

—আম্মু, আম্মু! দেখো, আব্বু এসেছে।

রেদোয়ান বাজারের ব্যাগটা নামিয়ে দুজনকেই কোলে তুলে নিল। মমতা ব্যাগের দিকে তাকিয়ে বলল,
—এই অভাবের সংসারে আবার এতকিছু কিনে আনতে গেলে কেন?

রেদোয়ান মৃদু হেসে বলল,
—টাকার অভাবে ওদের আপেল, বেদানা, আঙুর, কমলালেবুর মতো দামি ফল খাওয়াতে পারি না। তাই কলা এনেছি। ডিম, মাছ আর কলাও তো শরীরের জন্য ভালো। আমার ছেলেমেয়েরা সুস্থ থাকলেই আমি খুশি।

মমতা আর কিছু বলল না। মুখে ফুটে উঠল মায়াভরা হাসি।

সেদিন রাতে খাওয়ার পর সবাই একসঙ্গে বসেছিল। নয়ন হঠাৎ বলল,
—জানো আব্বু, আমি পড়াশোনা ভালো করি বলে স্কুলের স্যার-ম্যাডামরা আমাকে খুব ভালোবাসেন।

মণিও সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—আমি বড় হয়ে স্কুলের ম্যাডাম হব।

রেদোয়ান হেসে বলল,
—তাই নাকি মা?

—হ্যাঁ। আমি অনেক পড়াশোনা করব।

নয়ন বলল,
—আর আমি পুলিশ অফিসার হব। চোর-ডাকাত আর অপরাধীদের ধরে ভালো মানুষ বানানোর চেষ্টা করব।

ছেলেমেয়ের স্বপ্নের কথা শুনে রেদোয়ান ও মমতার চোখ আনন্দে ভরে উঠল। তারা দুজনকে কাছে টেনে নিয়ে কপালে চুমু দিল।

রেদোয়ান বলল,
—স্বপ্ন পূরণ করতে হলে কিন্তু মন দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে।

—হ্যাঁ আব্বু!— দুজন একসঙ্গে বলে উঠল।

তারপর সবাই ঘুমিয়ে পড়ল।

তারা জানত না, সেই রাতের পর তাদের জীবনে নেমে আসবে এক কঠিন পরীক্ষা।


পরদিন সকালে রেদোয়ান প্রতিদিনের মতোই স্ত্রী-সন্তানদের কাছ থেকে হাসিমুখে বিদায় নিয়ে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বের হলো।

কাজের জায়গার কাছাকাছি পৌঁছে রাস্তা পার হওয়ার সময় হঠাৎ একটি দ্রুতগামী ট্রাক তাকে সজোরে ধাক্কা দিল। মুহূর্তের মধ্যে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ল রেদোয়ান।

আশপাশের লোকজন ছুটে এলো। খবর পেয়ে রেদোয়ানের কর্মস্থলের মালিক রাব্বি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেন। রাব্বি ছিলেন দয়ালু ও মানবিক মানুষ। তিনি সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে রেদোয়ানকে হাসপাতালে পাঠালেন। একই সঙ্গে একজন কর্মচারীকে মমতার কাছে খবর দিতে পাঠালেন।

সেদিন মমতা নয়ন ও মণিকে স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি করছিল। হঠাৎ একজন লোক এসে দুর্ঘটনার খবর দিল।

খবরটি শুনে মমতার হাত-পা কাঁপতে শুরু করল। মনে হলো, চারপাশটা যেন অন্ধকার হয়ে আসছে।

—না! এমন হতে পারে না! —চিৎকার করে উঠল সে।

নয়ন ও মণিকে সঙ্গে নিয়ে সে ছুটে গেল হাসপাতালে।


কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।

হাসপাতালের একটি কক্ষে সাদা কাপড়ে ঢাকা পড়ে আছে রেদোয়ানের নিথর দেহ।

ডাক্তার মমতাকে শান্ত করার চেষ্টা করে বললেন,
—দুঃখিত। প্রচুর রক্তক্ষরণ ও বুকে গুরুতর আঘাতের কারণে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়েছে।

মমতা যেন পাথর হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর স্বামীর মুখের ওপর থেকে কাপড় সরিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

—হে আল্লাহ! আমার সব শেষ হয়ে গেল!

নয়ন ও মণিও বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল।

—আব্বু, তুমি আমাদের ছেড়ে কোথায় চলে গেলে?

সেদিন মমতা হারাল তার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়কে। নয়ন ও মণি হারাল তাদের প্রিয় বাবাকে।

রাব্বি হাসপাতালের সব খরচ ও দাফন-কাফনের ব্যয় বহন করলেন। যাওয়ার আগে মমতার হাতে কিছু টাকাও তুলে দিয়ে বললেন,
—বোন, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করো না। ওদের মানুষ করার চেষ্টা করো।

মমতা চোখের পানি মুছে মাথা নেড়ে বলল,
—দোয়া করবেন ভাইজান। আমি চেষ্টা করব।


স্বামীকে হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে মমতার অনেক সময় লেগেছিল। কিন্তু সে ভেঙে পড়েনি।

কারণ তার সামনে তখন দুটি ছোট মুখ— নয়ন ও মণি।

রেদোয়ান নেই, কিন্তু তার স্বপ্ন তো আছে।

মমতা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, যে করেই হোক সে তার সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করবে।

রাব্বির দেওয়া সামান্য কিছু টাকা দিয়ে মমতা ছোট্ট একটি ভাতের হোটেল শুরু করল। প্রথম দিকে দোকানটি ছিল খুবই ছোট। কখনো ক্রেতা আসত, কখনো সারা দিন বসে থাকতে হতো। তবু মমতা হাল ছাড়েনি।

নয়ন ও মণিও স্কুলের পড়াশোনার পাশাপাশি মাকে ছোটখাটো কাজে সাহায্য করত।

দিন যায়। মাস যায়। বছর পেরিয়ে যায়।

মমতা এক হাতে সংসার সামলেছে, অন্য হাতে সন্তানদের স্বপ্ন আগলে রেখেছে। নিজের কষ্টের কথা কখনো সন্তানদের বুঝতে দেয়নি। মায়ের আঁচলের ছায়ায় বড় হতে থাকে নয়ন ও মণি।

মমতার একটাই কথা ছিল—
—তোমরা ভালো করে পড়াশোনা করো। তোমাদের বাবার স্বপ্ন পূরণ করো।

সন্তান দুটিও মায়ের কথা রেখেছিল।

নয়ন পড়াশোনা শেষ করে একসময় একজন মেধাবী ও সাহসী পুলিশ কর্মকর্তা হলো। আর মণি উচ্চশিক্ষা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিল।

এদিকে মমতার ছোট্ট ভাতের হোটেলটিও ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠল। পরিশ্রম, সততা আর ভালো ব্যবহারের কারণে তার ব্যবসার সুনাম ছড়িয়ে পড়ল। একসময় সেই ছোট্ট হোটেল পরিণত হলো একটি বড় রেস্টুরেন্টে। সেখানে কাজ করতে লাগল অনেক মানুষ।

মমতা তখনও ভুলে যায়নি সেই ছোট্ট ঘর, স্বামী রেদোয়ান আর দুই শিশুকে নিয়ে কাটানো দিনগুলো।


একদিন দুপুরে রাব্বি কয়েকজন সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে মমতার রেস্টুরেন্টে খেতে এলেন।

খাওয়া শেষে বিল দেওয়ার জন্য কাউন্টারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। ঠিক তখনই বাইরে থেকে একটি গাড়ি এসে থামল।

গাড়ি থেকে নামল একজন পুলিশ কর্মকর্তা, তার স্ত্রী আঁখি, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা এবং তার স্বামী চয়ন।

তাদের সঙ্গে ছিলেন মমতা।

রাব্বি মমতাকে দেখেও প্রথমে চিনতে পারলেন না।

মমতা এগিয়ে গিয়ে বলল,
—ভাইজান, আমাকে চিনতে পেরেছেন?

রাব্বি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন,
—ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি বলে মনে হচ্ছে।

মমতা ধীরে ধীরে বহু বছর আগের সেই দিনের কথা মনে করিয়ে দিল। রেদোয়ানের দুর্ঘটনা, হাসপাতাল, রাব্বির সাহায্য— সবকিছু।

হঠাৎ রাব্বির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
—ও হ্যাঁ! মনে পড়েছে। তুমি রেদোয়ানের স্ত্রী!

মমতা হাসল।

—জি ভাইজান।

এরপর সে নয়ন, মণি, আঁখি ও চয়নের সঙ্গে রাব্বির পরিচয় করিয়ে দিল।

রাব্বি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।

মমতা বলল,
—ভাইজান, আপনি হয়তো খেয়াল করেননি। এই রেস্টুরেন্টের নামটা আমার স্বামী রেদোয়ানের নামে রেখেছি।

রাব্বির চোখে তখন বিস্ময়।

মমতা বলল,
—আজ আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, তার পেছনে আপনার অবদানও আছে। রেদোয়ান মারা যাওয়ার পর আপনি যে সামান্য টাকাটা আমাকে দিয়েছিলেন, সেটাই ছিল আমার নতুন পথচলার শুরু। সেই টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলাম। তারপর শুধু পরিশ্রম করে গেছি।

রাব্বি আবেগাপ্লুত হয়ে বললেন,
—তুমি এত বছর পরও সেই সামান্য টাকার কথা মনে রেখেছ?

মমতা মৃদু হেসে বলল,
—কীভাবে ভুলব ভাইজান? উপকার কখনো ছোট হয় না। মানুষ হয়তো সাহায্যের পরিমাণ ভুলে যায়, কিন্তু বিপদের সময় কে পাশে দাঁড়িয়েছিল— সেটা ভুলে যাওয়া উচিত নয়।

তারপর মমতা ক্যাশ কাউন্টারে বসা কর্মচারীকে বলল,
—ভাইজানের কাছ থেকে আজকের বিল নেবেন না।

রাব্বি সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
—না, না! এটা তো ব্যবসার জায়গা। বিল নেবেন।

মমতা হাসতে হাসতে বলল,
—ঠিক আছে। আজকের বিলটা আমি দিলাম। পরের বার যখন আসবেন, তখন বিল দেবেন।

রাব্বিও হেসে ফেললেন।

বিদায় নেওয়ার আগে মমতা বলল,
—আর সময় করে একদিন পরিবারের সবাইকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসবেন। আপনাদের সঙ্গে অনেক কথা বলতে চাই।

রাব্বি বললেন,
—অবশ্যই আসব বোন। তোমাদের জন্য আমার অনেক শুভকামনা রইল।

রাব্বি চলে গেলেন।

মমতা কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর নয়ন ও মণির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—তোমাদের বাবা আজ থাকলে তোমাদের দেখে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন।

নয়ন মায়ের হাত ধরল। মণি মায়ের কাঁধে মাথা রাখল।

মমতা দুজনকেই নিজের আঁচলের নিচে টেনে নিল।

সেই আঁচলেই তো লুকিয়ে ছিল তাদের শৈশবের নিরাপত্তা, মায়ের অগাধ ভালোবাসা আর জীবনের সব কঠিন সময় পার হয়ে ওঠার সাহস।

মায়ের ভালোবাসার আঁচল কখনো পুরোনো হয় না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার ছায়া আরও গভীর হয়।



সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে
  বিষয়:   মা  আঁচল 


Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: