সম্প্রতি অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার কবি হিশাম মুহাম্মদ আল-জাদবাহ তার কাব্যগ্রন্থ ‘আলা জিদারিল গায়ম’ (মেঘের দেয়ালের ওপর) প্রকাশের ঘোষণা দেন তার ফেসবুক পোস্টে। তাতে তিনি শিল্পী হিসেবে জানান বাংলাদেশি আলেমা ও প্রচ্ছদশিল্পী নাঈমা তামান্নার কথা। শুধু তাই নয়, কাব্যগ্রন্থটি তিনি উৎসর্গ করেন শিল্পী নাঈমা তামান্নার উদ্দেশে। এতে তিনি বাংলাদেশকে বিশেষভাবে স্মরণ করেন। এই ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে উচ্চারিত হয় বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের একজন নারী আলেমা ও শিল্পীর কথা। আরববিশ্ব থেকে অগণিত পাঠক বাংলাদেশের শিল্পীকে শুভেচ্ছা জানান।
কাব্যগ্রন্থে শুরুতেই উৎসর্গপত্রে কবি হিশাম মুহাম্মদ আল-জাদবাহ লিখেছেন, ‘নাঈমা তামান্নার প্রতি, যে আমার কাব্যগ্রন্থের শব্দকে স্পর্শ করেছে। কৃতজ্ঞতা তোমার সুউচ্চ শিল্পবোধ ও নান্দনিক সৌন্দর্যের জন্য, যা কাব্যগ্রন্থের মলাটকে জীবন্ত করে তুলেছে। ফলে এই শিল্পকর্ম কবিতারই এক সম্প্রসারণ হয়ে উঠেছে এবং অর্থ যেন একটি চেহারা পেয়েছে, যা তার শব্দগুলো পড়ার আগেই চোখে ধরা দেয়। ধন্যবাদ, তোমার এই সৃজনশীলতার জন্য— যা সাক্ষী হয়ে থাকবে যে, সৌন্দর্যের আলাদা একটি ভাষা রয়েছে। ধন্যবাদ নাঈমা, ধন্যবাদ বাংলাদেশ।’ প্রচ্ছদ দেখে ফিলিস্তিন ও মিসরের অনেকেই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন এবং বাংলাদেশের শিল্পী নাঈমা তামান্নাকেও অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে মোবারকবাদ জানিয়েছেন।
শিল্পী নাঈমা তামান্নার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। নাঈমা তামান্না জানান, ফিলিস্তিনের কবি হিশাম এক সন্ধ্যায় আমার কাছে একটি বইয়ের প্রচ্ছদ করে দেওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি বর্তমানে গাজার খান ইউনিসের বাসিন্দা।
আমার আগের কাজ দেখে তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন, কারণ সোশ্যাল মিডিয়ায় আমার সঙ্গে তার পরিচিতি ছিল। তার প্রস্তাব শোনামাত্রই আমি পরম শ্রদ্ধায় রাজি হয়ে যাই। কারণ ফিলিস্তিনের মুক্তিকামীদের স্ট্রাগলের সামান্য অংশ হতে পারা আমার জন্য পরম এক প্রাপ্তি। কিন্তু সেদিন রাত সাড়ে এগারোটার দিকে তিনি জানতে চান, কভারটি প্রস্তুত কি না। বইটি প্রেসে দেওয়ার জন্য একেবারে প্রস্তুত, কেবল আমার প্রচ্ছদের অপেক্ষা। শুনে আমি কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলাম। যেহেতু আমি জলরঙে কাজ করি, তাই কনসেপ্ট ভাবার জন্য আমার অন্তত দুদিন সময় লাগে। তদুপরি বেশ কিছু দিন ধরে তীব্র জ্বরে ভুগছিলাম। কিন্তু তার তাড়া দেওয়ার কারণটি আমাকে মর্মান্তিকভাবে আলোড়িত করে— সেখানে প্রতিটি মুহূর্তই তো ‘বোনাস লাইফ’! বই প্রেসে যাওয়ার আগেই যদি তিনি শহিদ হয়ে যান! আর কোনো অজুহাত না দেখিয়ে আমি বললাম, ইনশাআল্লাহ কালই দিয়ে দেব।
প্রচ্ছদ অঙ্কনের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে নাঈমা তামান্না বলেন, পরের দিন ফজর পড়েই আমি সোজা টেবিলে গিয়ে বসলাম। অথচ তখনও মাথা সম্পূর্ণ শূন্য। বইটির সংক্ষিপ্ত পিডিএফে চোখ বোলাতে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ল কিছু দিন আগেই ইসরাইলি বাহিনী গাজার শিশুদের ঘুড়ি ওড়ানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। আর কালক্ষেপণ না করে খাতায় কোনো পেন্সিল স্কেচ না করেই সরাসরি তুলি তুলে নিলাম হাতে। ফুটিয়ে তুললাম এক দৃশ্যপট— একটি কেফিয়া জড়ানো শিশু ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে ওড়াচ্ছে ফিলিস্তিনি পতাকার ঘুড়ি। ওপর থেকে ঢেলে দিলাম একগুচ্ছ নানান রঙের মেঘ। সেই মেঘের দেয়াল চুইয়ে বারুদের ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে ঝরে পড়ছে এক অপ্রতিরোধ্য জাতির অদম্য উপাখ্যান। সম্পূর্ণ কাজটি শেষ করতে আমার মাত্র ১৫ মিনিট সময় লেগেছিল। আঁকাটি শুকানোর পর দুরুদুরু বুকে ছবিটি পাঠালাম সেই কবির কাছে। সঙ্গে এ-ও জানিয়ে দিলাম, এটি পছন্দ না হলে আমি আরও একশটি প্রচ্ছদ এঁকে দিতেও রাজি আছি। ছবিটি দেখেই তিনি দারুণ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন! বললেন, ‘আমার কবিতার ভাষা ফুটে উঠেছে আপনার এই চিত্রে। ঠিক এটাই আমি চেয়েছিলাম।’ শুনে আনন্দে ও আবেগে তখন আমার চোখ ভিজে এসেছিল।
নাঈমা তামান্না আরও বলেন, এরপর নামলিপি আর ব্যাক-কভারের কাজ শেষ করে টাইপোগ্রাফি নিয়ে কবির সঙ্গে আলাপ করছিলাম। হঠাৎ ওপাশ থেকে আর কোনো সাড়া নেই। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিডে চোখ রাখতেই বুকটা আতঙ্কে ভারী হয়ে উঠল— গাজায় মাত্রই এক ভয়াবহ হামলা হয়েছে! লেখক ও তার পরিবার নিরাপদ আছেন কি না, সেই চিন্তায় দম আটকে আসার উপক্রম।
উদ্বেগজনক এক ঘণ্টা পর তিনি ফিরে এসে জানালেন যে, হামলাটি সত্যিই হয়েছিল, তবে তারা সালামত আছেন। সেদিন পৃথক হামলায় শাহাদাতবরণ করেছিলেন ৯ জন নিষ্পাপ মানুষ। অবশেষে সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে বইটি প্রেসে পৌঁছেছে। গাজার প্রায় সব ছাপাখানা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় বইটি মিসরের ‘দারুল আরকাম’ থেকে প্রকাশিত হচ্ছে। কাজটা করতে পেরে আমি এতটাই আনন্দিত, যদি এটিই আমার জীবনের শেষ কাজ হয় তবু মনে আক্ষেপ থাকবে না।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে