কবিতা নিয়েই থাকি। এটা একটা ঘোর বলা যেতে পারে। কোনো এককালে কবিদের চেহারা ছিল আলুথালু, পোশাকে-আশাকে ঢিলেঢালা— কিছুটা অযত্নের ছাপ থাকত। কারণও আছে। সেটা কাকে বোঝানো যাবে! কবিরা সত্যিকার অর্থে ভাবুক মানুষ। শব্দ নিয়েই তাদের খেলা।
তাই জুতসই শব্দের খোঁজে থাকতে হয় সদা সর্বদা। রবীন্দ্রনাথ যে বলেছেন— ‘খ্যাপা খুঁজে খুঁজে ফিরে পরশ পাথর’— সে-ই ঘোরলাগা বাণী! সেটাই কবির লক্ষণ। তবে সবই মনে মনে। কাউকে বোঝানোর কিছু নেই, কেউ বুঝবেও না। ঘরের মানুষও ঠিকমতো বুঝে ওঠে না— কেন এসব পাগলামি! স্বজনরাও কেউ টিটকার দিতে কসুর করে না কবিকে। এতসব সহ্য করে কবি তার পথে হাঁটেন আপনমনে নিরবচ্ছিন্ন। আমারও সেই পথ।
একবার কেউ এপথে নামলে তার আর নিস্তার নেই। সবকিছুতে বিচ্ছিন্নতার সুযোগ আছে, ভিন্নপথ আছে— একমাত্র লেখকজীবনই অবিচ্ছেদ্য। কেন? কারণ, যে বা যারা অলৌকিক আনন্দ একবার পায়, তারা আর ভিন পথে যেতে পারে না। গেলে এক ধরনের মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্ক্ষা তো থেকেই যায়। বলছি তো এটা একটা ঘোর— অনির্বচনীয় ঘোর। আমরা বেশিরভাগ মানুষ বাগানে বা টবে ফুল ফোটাই।
কী হয় তাতে— ভাত-কাপড় হয়? না হয় না, তবু বাগান করি। কবিতা বা সাহিত্যচর্চা বা শিল্পচর্চা কিছুটা তেমন জিনিস। তারও চেয়ে অনেক অনেক বেশি ব্যাপার। কবিতা সময়কে ধারণ করে। আমরা প্রতিদিন তাকে তুলে ধরার চেষ্টা করি বিস্তীর্ণ ক্যানভাসে।
কবিতা লিখছি প্রতিদিনই। তবে আজকাল গদ্য লেখারও তাগিদ আসে। লিখতে হয়। যেমন এখন লিখছি। কয়েক দিন ধরে কবি শামসুর রাহমানের ‘গদ্য সংগ্রহ’ পড়ছি। বড় বই— ৯৬০ পৃষ্ঠার। মজা লাগছে এ জন্য যে, তার গদ্য সহজ। এতে কবিতা ছাড়া প্রায় বাকি সব রচনা, স্মৃতিকথা, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, একান্ত ভাবনা— সবই স্থান পেয়েছে। আমার বেশ মজা লাগছিল তার একান্ত ভাবনা সম্পর্কিত স্মৃতিমুখর ছোট ছোট লেখাগুলো পড়তে। কবিরা অনেকে গদ্য লিখতে চান না। রফিক আজাদকে তো ধরে-বেঁধে গদ্য লেখানোর জন্য বসাতে হতো। সবাই পারত না, দুয়েকজন ছাড়া! শামসুর রাহমানের বইটি প্রকাশিত হয়েছে কলকাতা থেকে ২০০৫ সালে। সম্পাদনা করেছেন গৌতম রায়।
আর একটা মজার বই আমার হাতে এখন। বাঙালি লেখকের ইংরেজিতে লেখা বই— ‘The Emperor of All Maladies’। লেখক— তরুণ চিকিৎসক সিদ্ধার্থ মুখার্জি, ক্যানসার-গবেষক। বইটিতে তিনি ক্যানসার রোগের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন গল্পচ্ছলে। সেখানে তথ্য আছে, ব্যাখ্যা আছে, দারুণ সব গল্পের উপাদান আছে। এটি ৫৮৫ পৃষ্ঠার বই। বইটি লেখার জন্য তরুণ এই চিকিৎসক উদ্বুদ্ধ হয়েছেন এক রোগীর প্রশ্নোত্তর স্বরূপ। তাতে ক্যানসার কি, কেন হয়, এর উৎপত্তি ও বিকাশ সম্পর্কে বলা হয়েছে। এসব বলতে গিয়ে লেখক কৌতুক-রসও যুক্ত করেছেন বিভিন্ন অংশে। বইটি প্রকাশিত হয়েছে ২০১০ সালে নিউইয়র্ক থেকে। পরের বছর পুলিৎজার পুরস্কার পায়।
আর একটি বইয়ের নাম— ‘The Naked Pen’। এটি একটি বই! কী বিষয়, বলতে খটকা হয়। বলা ভালো— কবিতার বই। লেখক মরক্কো-থাই কবি Samira Elbahja। কবিতার কাঠামোকে ভেঙে নতুনভাবে কাঠামো বানানোর চেষ্ঠা করেছেন এখানে। কারণ, তিনি কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির স্থাপত্যবিজ্ঞানের ছাত্রী। বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ১২৮। প্রকাশিত হয়েছে লন্ডন থেকে ২০২৫ সালে। এটি আমাকে বেশ টানল। পড়ছি এখনও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। সঙ্গে আমাদের কবিতাকে আলাদাভাবে বোঝার চেষ্টা করছি। দেখছি আমাদের ও পশ্চিম বাংলা বা আসাম-ত্রিপুরার কবিতা বিভিন্ন সংকলন থেকে কী পার্থক্য। এসব কবিতার ভাষাগত মিল থাকলেও উপলব্ধিগত ও প্রকাশগত পার্থক্য স্পষ্ট পরিলক্ষিত হয় কাব্যপ্রকাশে।
কবিতাই যেহেতু প্রধান ক্ষেত্র, তাই যতদিন যায় কবিতা নতুন নতুন দাবি তোলে, তুলবে। তরুণী কবির ‘The Naked Pen’ পড়ে ভালো লাগল এ জন্য যে, কবিতার বক্তব্যকে এখানে ভিন্নভাবে দেখানো হয়েছে। এই তরুণরাই আগামীর কান্ডারী। আমাদের তরুণরাও। আমাদের তরুণদেরও কারও কারও চমকপ্রদ বাক্যবন্ধ আমাদের প্রাণিত করে। কবি আল মাহমুদ সবসময় একটা কথা বলতেন— আমাদের উদ্দেশ্যে বলতেন, আমাদের পরের তরুণদের উদ্দেশ্যেও বলে গেছেন। তার কথাটি ছিল— তরুণরা পড়ে কম, যা তাদেরকে কূপের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখে। তার কথার সুর তুলে আমিও উপলব্ধি করে বলতে চাই— কবিতা স্থবির হয়ে থাকলে চলবে না, নতুন পথে যাত্রার সময় বেছে নিতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে