ছড়া সাহিত্যের স্বরূপ ও বিবর্তন

আবু সাইদ কামাল

সাহিত্য

প্রাচীনকালে ছড়া মূলত মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত ঝংকারময় পদ্যকে বোঝাত। যদিও ছড়া এখন শুধু মুখে উচ্চারিত হয় না, বহু আগেই

2026-09-04T19:42:40+00:00
2026-09-04T19:42:40+00:00
 
  শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২০ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সাহিত্য
ছড়া সাহিত্যের স্বরূপ ও বিবর্তন
আবু সাইদ কামাল
প্রকাশ: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৪২ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
প্রাচীনকালে ছড়া মূলত মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত ঝংকারময় পদ্যকে বোঝাত। যদিও ছড়া এখন শুধু মুখে উচ্চারিত হয় না, বহু আগেই লিখিত রূপ নিয়েছে। স্বরবৃত্ত ছন্দ ছড়ার সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত এবং ছড়ার স্বাভাবিক গতি ও ঝংকার প্রকাশে এ ছন্দের ব্যবহার বেশি। তবে ছড়া কেবল স্বরবৃত্ত ছন্দেই সীমাবদ্ধ নয়।

ছড়ার প্রধান দাবি ধ্বনিময়তা এবং সুর-ঝংকার। বিশেষত শিশুতোষ লোকছড়ায় অর্থের সুসংহত বিন্যাসের চেয়ে ধ্বনি, ছন্দ, পুনরাবৃত্তি, সুর ও আনন্দের আবেদনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যদিও আধুনিক ছড়া সে অবস্থান থেকে অনেকটা সরে এসেছে। পদ্য এবং ছড়ার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে বলেও অনেকে মনে করেন। কারও মতে, পদ্যের বক্তব্য সহজবোধ্য ও সুস্পষ্ট হলেও ছড়ায় থাকে প্রাঞ্জলতা, রহস্য এবং ফান বা এক ধরনের মজা।

Advertisement
বাংলা ছড়ার শিকড় অত্যন্ত প্রাচীন। লিখিত সাহিত্যের বিকাশের বহু আগে লোকসমাজে মুখে মুখে ছড়া রচিত ও প্রচলিত হয়েছে। এর কোনো কোনো উপাদানের উৎস বাংলা ভাষা ও লোকসংস্কৃতির প্রাচীন স্তর পর্যন্ত অনুসরণ করা যায়। লিখিত সাহিত্যের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের আগে ছড়া ছিল লোকসমাজের মৌখিক সাহিত্যচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ। সে কারণে ছড়ার একটি বড় অংশকে লৌকিক সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ছড়ার মাধ্যমেই মানুষ তার মনের নান্দনিক ভাব প্রকাশ করত। আবার কেউ কেউ ছড়াকে শিশুদের কাব্য বলেও অভিহিত করেছেন। তবে আধুনিক সাহিত্যিক ও গবেষকদের আলোচনায় ছড়া সাহিত্যের একটি স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ রূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে; এর জনপ্রিয়তা ও জনসম্পৃক্ততা বাংলা সাহিত্যে বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

বুদ্ধদেব বসু বলেন, আধুনিক কবির হাতে ছড়া বেরোতে পারে শুধু এই শর্তে যে, তাতে তিনি বক্তব্য কিছু দেবেন, অথচ সেটুকুর বেশি দেবেন না যেটুকু এই ‘হালকা ছোটো চটুল শরীরে’ ধরে যায়। একেবারে সারাংশ কিছু না থাকলে তা নেহাৎই ‘শব্দের টুংটাং’ হয়ে পড়ে, আবার মাত্রা একটু বেশি হলেও ছড়া আর থাকে না।

বুদ্ধদেব বসুর এই বক্তব্যের আলোকে ‘ছড়া’ বলতে শুধু ছোট, মিলযুক্ত বা ছন্দোবদ্ধ পদ্যকে বোঝালে ঠিক হবে না। তিনি মূলত ছড়ার স্বভাব ও সীমা বোঝাতে চেয়েছেন। সহজ করে বলা যায়, ছড়া হলো এমন একটি হালকা, ছোট, চটুল ও ছন্দনির্ভর পদ্যরূপ, যার মধ্যে কিছু বক্তব্য বা ভাব থাকে; কিন্তু সেই বক্তব্য এত বেশি নয় যে ছড়ার হালকা শরীর ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। ফলে ছড়ার তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়— হালকা ও সংক্ষিপ্ত অবয়ব, চটুল ছন্দ ও শব্দের ঝংকার এবং বক্তব্যের সংযম। তবে ‘হালকা’ মানে অগভীর বা মূল্যহীন নয়। একটি ভালো ছড়া অল্প কথায় গভীর ভাব, ব্যঙ্গ, কৌতুক, শিশু মনস্কতা, সামাজিক বক্তব্য কিংবা জীবনবোধও প্রকাশ করতে পারে।


অর্থাৎ ছড়ার প্রাণ হলো— হালকা শরীরে সামান্য অথচ অর্থপূর্ণ বক্তব্যের সঙ্গে ছন্দ, শব্দের খেলা ও চটুলতার সমন্বয়। শব্দের ঝংকার, ছন্দের গতি, স্মৃতির সহজ অনুরণন এবং আনন্দের আবেশে ছড়া তার স্বতন্ত্র সৌন্দর্য লাভ করে।

বাংলা ছড়ার বিশাল ভান্ডারকে প্রধানত দুটি অংশে দেখা যায়— (ক) লোকছড়া এবং (খ) আধুনিক ছড়া। অজ্ঞাত রচয়িতার মৌখিক সৃষ্টি ও লোকসমাজে প্রচলিত ছড়াই লোকছড়া; আধুনিক যুগে সচেতন সাহিত্যিকদের রচিত ছড়া আধুনিক ছড়া।

লোকছড়ার বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অসংলগ্নতা, পুনরাবৃত্তি, ধ্বনিমাধুর্য ও সহজাত ছন্দ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, আধুনিক ছড়ায় তেমনি বক্তব্য, ব্যঙ্গ, কৌতুক, সামাজিক চেতনা ও জীবনবোধের পরিসর অনেক বিস্তৃত দেখা যায়।

আশুতোষ ভট্টাচার্যের আলোচনায় লোকছড়ার মৌখিকতা, ছন্দ ও গঠনগত বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়। তার মতে, ছড়া মৌখিক আবৃত্তিনির্ভর; এর সুর বৈচিত্র্যহীন, সংগীতের মতো বৈচিত্র্যময় নয়। ছড়ায় পূর্ণাঙ্গ কাহিনি না-ও থাকতে পারে; বিচ্ছিন্ন চিত্র ও ভাবের সমাবেশই এর বৈশিষ্ট্য। একই ছড়ার মধ্যে একটি অংশের সঙ্গে অন্য অংশ সহজেই জুড়ে যেতে পারে। ছড়ার ছন্দ শ্বাসাঘাত-প্রধান; প্রতি পর্বের আদিতে ঝোঁক পড়ে বলে একে প্রাস্বরিক বা বল-প্রধান ছন্দও বলা হয়। স্বরবৃত্ত নামটিই এর বহুল প্রচলিত নাম।

উনিশ শতকের শেষ দিকে ছড়া সম্পর্কে সচেতন সাহিত্যিক ও গবেষণামূলক আলোচনা ক্রমে শুরু হয়। গত এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ছড়া নিয়ে বিস্তর আলোচনা হলেও এর এমন কোনো একক ও সর্বসম্মত সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়নি, যা এর সব বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করতে পারে। ছড়ার সংজ্ঞা নির্ধারিত না হলেও এর বৈশিষ্ট্য নিয়ে অনেকে মতামত দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তার হাত দিয়েই বাংলা লোকছড়ার সংগ্রহ ও প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ শুরু হয়। তিনি এগুলোকে ছেলেভোলানো ছড়া বা মেয়েলি ছড়া নামে অভিহিত করে এ সম্পর্কিত আলোচনারও সূত্রপাত করেন। বলা যায়, তার ‘ছেলেভোলানো ছড়া’ বিষয়ক আলোচনা বাংলা ছড়াসাহিত্যের তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

রবীন্দ্রনাথ তার ‘ছিন্নপত্রাবলী’র ৫ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৪-এর একটি পত্রে উল্লেখ করেন— ‘ছড়ার একটা স্বতন্ত্র রাজ্য আছে, সেখানে কোনো আইনকানুন নেই— মেঘরাজ্যের মতো।’ তার ছড়াভাবনা মূলত সুর, ছন্দ ও ধ্বনিময়তার ওপর প্রতিষ্ঠিত। ছড়া চোখের দেখার চেয়ে কানের শোনার এবং মনের ভেতরে গেঁথে যাওয়ার বস্তু। তাই ছড়ার সহজ সুর, হালকা চাল, ধ্বনি ও যতির ভূমিকার প্রতি তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। ‘ছড়ার ছবি’তে তিনি বলেন, ‘ছড়ার ছন্দ প্রাকৃত ভাষার ঘরাও ছন্দ’; এর ভঙ্গি ও সজ্জায় কাব্যসৌন্দর্য সহজে প্রবেশ করে, অথচ অজ্ঞাতসারে। তার মতে, গভীর কথাও ছড়ায় হালকা চালে প্রকাশিত হতে পারে।

সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ তার গবেষণা-সন্দর্ভ ‘ছড়ায় বাঙালী সমাজ ও সংস্কৃতি’তে রবীন্দ্র-ভাবনায় ছড়ার বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন— ছড়া নির্দিষ্ট নিয়মকানুনের অধীন নয়; এতে ভাব ও চিত্রের অসংলগ্নতা থাকতে পারে; অর্থবোধের চেয়ে সুরময় ধ্বনি গুরুত্বপূর্ণ; যতির ভূমিকা শুধু বিরতির জন্য নয় এবং ছড়ার ছন্দ প্রাকৃত ভাষার ছন্দ। তবে এসব বৈশিষ্ট্য মূলত লোকছড়ার প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য; আধুনিক ছড়ার ক্ষেত্রে এগুলোকে অবিকল শর্ত হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।


বুদ্ধদেব বসু সুকুমার রায় সম্পর্কে বলতে গিয়ে ছড়াসাহিত্যে তার অসামান্য দক্ষতার কথা উল্লেখ করেছেন। তার মতে, সুকুমারের পদ্যজাতীয় অধিকাংশ রচনাই উৎকৃষ্ট পদ্য; মাঝেমধ্যে তিনি পদ্যের সীমা পেরিয়ে কবিতার স্তর স্পর্শ করেছেন। নিছক পদ্য রচনার কারিগরিতে, ছন্দ-মিলের অপ্রতিহত পরিচালনায় তার দক্ষতা অসামান্য। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে বুদ্ধদেব বসু বলেন, সুকুমার রায় অনেক বেশি পরিণত মনের মানুষ এবং তার কলাকৌশলও অনেক বেশি সাবালক। তাই তার রচনা ছোটদের জন্য হলেও বয়স্কদেরও ভোগ্যবস্তু হয়েছে।

বুদ্ধদেব বসুর এই আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, সুকুমার রায়ের সব রচনাকে এককথায় ছড়া বলা যায় না; তার বহু রচনা উৎকৃষ্ট পদ্য, আবার কিছু রচনা ছড়ার স্বভাব ও বৈশিষ্ট্যকে অসাধারণ শিল্পসাফল্যে উন্নীত করেছে। ‘আবোলতাবোল’-এর সাহিত্যিক সাফল্যও কেবল শিশুমনোরঞ্জনে সীমাবদ্ধ নয়। শব্দকৌতুক, উদ্ভট কল্পনা, ছন্দের চমৎকারিত্ব ও তীন্ন ব্যঙ্গের সমন্বয়ে সুকুমার রায় ছড়াকে এক নতুন শিল্পভুবন দিয়েছেন। তার ননসেন্স ও কৌতুকধর্মী রচনা বাংলা ছড়ার বিবর্তনে একটি স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করেছে।

অন্নদাশঙ্কর রায়ের মতে, ছড়া কৃত্রিম বা শুধু হালকা চালের কোনো পদ্য নয়; এটি আবহমানকাল ধরে চলে আসা দেশজ ও লৌকিক ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে থাকা প্রাণবন্ত প্রকাশ। তিনি ছড়ার ক্ষেত্রে ধ্বনি, মেজাজ, রস, অসংলগ্নতা, চিত্রময়তা, মিল, ইমেজ, ফান, আকস্মিকতা ইত্যাদির ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, ছড়ার উপকরণ সমসাময়িক ঘটনা বা পরিস্থিতি থেকেও আসতে পারে। ফলে আধুনিক ছড়া লোকঐতিহ্যকে ধারণ করেও সমকালীন জীবন, সমাজ ও মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ছড়া মৌখিক লোকঐতিহ্যের গণ্ডি পেরিয়ে লিখিত সাহিত্যরূপ পেয়েছে; শিশুমনোরঞ্জনের পাশাপাশি ব্যঙ্গ, কৌতুক, সমাজচেতনা ও জীবনবোধ প্রকাশের শক্তিও অর্জন করেছে। তবে তার স্বাতন্ত্র্যের মূল ভিত্তি-ধ্বনি, ছন্দ, লঘুতা, চটুলতা ও স্মরণযোগ্যতা-অক্ষুণ্ন রয়েছে।

হাজার বছরের ঐতিহ্য বহনকারী ছড়াকে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রেখেই সমকালীন সাহিত্যে বিকশিত হতে দিতে হবে। ছড়া, কবিতা ও পদ্য— প্রতিটিরই স্বতন্ত্র শিল্পসত্তা রয়েছে; তবে ছড়া পদ্যেরই একটি স্বতন্ত্র শিল্পরীতি, যার নিজস্ব প্রাণশক্তি ধ্বনি, ছন্দ, লঘুতা, চটুলতা ও সংক্ষিপ্ততায়। তাই একটির পরিচয় অন্যটির মধ্যে বিলীন করা সমীচীন নয়। ছড়ার প্রকৃতি ও নির্ধারণসূত্র নিয়ে আরও নির্মোহ, সুশৃঙ্খল ও গভীর পর্যালোচনা প্রয়োজন। কারণ ছড়াকে যথার্থ ছড়া হয়ে উঠতে সহায়তা করাই শুধু ছড়ার মর্যাদা রক্ষা নয়, বাংলা সাহিত্যের বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধিও অক্ষুণ্ন রাখার দায়।


সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে
  বিষয়:   ছড়া  সাহিত্য  স্বরূপ  বিবর্তন 


Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: