কদম সামনে বাড়াও
মঈনুস সুলতান
স্টিম ইঞ্জিনের ঝিকঝিক বাষ্পের ভেতর—
ছেড়ে এ শহর— আসা যেতে পারে
নাইরোবি কিংবা গ্রীষ্মময় আর্দ্র নাইজেরিয়ায়,
ম্যাপল পাতার বর্ণাঢ্য আগুনে পোড়ে চার্চ
দূরের মানুষ— কাছে এসে হয়েছ কী অসহায়
কাঠের ক্রুশে সওয়ার হয়ে পোড়ে দেখো যিশু,
ওজু সেরে কারা তাঁবুতে জায়নামাজ বিছায়
তটে পাল তোলা পাইরেট বোট নিয়ে ভাসে মোগাদিসু;
নয় সহিষ্ণু স্থির— সফর নৃত্য বিশেষ— ব্যাপক-অধীর,
কত্থকের এ মুদ্রায় কখনো ঘর কখনো-বা পথ—
পার হয়ে লিমপোপো নদী, ধরেছ রাতের রেলগাড়ি
আকাশগঙ্গার পাড়ে নেমেছে কাশফুল শুভ্র শরৎ;
ঝরছে অতি ধীরে ম্যোপোল বিরিক্ষের রঙিন পত্রালী,
ভাটি বেলায় ভরেছে গোলা কাটা শস্যে থোকা থোকা স্বর্ণালি,
রোডম্যাপ হাতে নাও— যতি নয় অনুভব করো গতি
কদম সামনে বাড়াও।
সুচিত্রা সেন ও আমি
আসিফ নূর
আমাদের মহানায়িকা সুচিত্রা সেন— জীবনের শেষ
পঁয়ত্রিশটি বছর লোকচক্ষুর অন্তরালেই ছিলেন,
হলিউড-সম্রাজ্ঞী গ্রেটা গার্বোর মতোই চির রহস্যগন্ধী;
মাননীয়ার এই নিভৃতচারিতা। প্রিয় কন্যা মুনমুন,
দুই নাতনি রিয়া-রাইমাকেও থাকতে হতো দূরে দূরে।
সাংবাদিকের নাম শুনলেই আঁতকে উঠতেন ভয়ে,
আত্মার সজনরাও ভাঙতে পারেনি তার স্বেচ্ছানির্বাসন;
মঞ্চে ওঠার আপত্তিতেই ফিরিয়ে দিয়েছেন রাষ্ট্রপদক।
মহানায়ক উত্তম কুমার নই, অতি সাধারণ আমি;
তবু মহানায়িকার ধাঁচেই আমার ভেতর নিঃশব্দে
মাথা তুলেছে নিঃসঙ্গপ্রীতির মৌন পাহাড়। অসুস্থ মায়ের
বিছানায় শুই না আগের মতো, তালকাটা কথা বলি
স্ত্রীর সঙ্গে; পুত্রত্রয়ের কোলাহলেও ভীষণ অরুচি।
বন্ধুদের হাসিঠাট্টা, চা-কফির ধূমল আড্ডা ছেড়েছি কবে...
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ডাকও আমাকে টানে না এখন—
বিয়ে, জন্মদিন, জানাজায় আমি আজ নিত্য অনুপস্থিত;
ধুম পানশালায়ও খুঁজে নিই আঁধার-আড়াল কোণ।
সুচিত্রা সেনের মতো নিবিড় অন্তরালে যাইনি যদিও,
তবু এক অদ্ভুত আড়ালে জনসমক্ষে ঢাকি নিজেকে—
সবার পাশেই আছি; অথচ কারও সঙ্গেই নেই আসলে।
নিজেকে সবারচে’ বেশি অসহ্য লাগে বলেই ইদানীং
চুল আঁচড়াতে গিয়ে আর আয়নার মুখোমুখি দাঁড়াই না।
বনফুল
হাদিউল ইসলাম
তোমার প্রথম যৌবনের সওগাত
দিয়েছ বসন্তে
সর্বাঙ্গে উতল আন্তরিক
তার তেজস্ক্রিয়তা ছুঁয়েছে মহাকাল
কচুরি পানার ফুলের মতো উজ্জ্বল
তোমার নামের পঞ্জিকা এখনও নতুন
কস্তুরী সৌরভে এখনও ভুলিয়ে রাখে
সংঘাতের সব কলকবজা
গন্দমের প্রায়শ্চিত্তের ভেতরে
অনেক ঝোপজঙ্গলের বন্ধন এড়িয়ে
তামাদি হওয়া স্বর্গের আদল-
কোনো এক বনফুল তাকিয়ে রয়েছ
তারুণ্য
ফারজানা ইয়াসমিন
তারুণ্যের শক্তি ও মনোবলের জয়জয়কার এই ধরণিতে,
সব বাধাবিপত্তি পাড়ি দিয়ে তারা আনে জয় ছিনিয়ে।
তাদের অদম্য উচ্ছ্বাসে অন্ধকার ভেদ করে আসে আলো,
তাদের চোখে রঙিন স্বপ্ন বুকে আশাজাগানিয়া প্রেম,
সাহসী বীর যোদ্ধা তারা জীবন যুদ্ধের ময়দানে।
নিয়মের শিকল ভেঙে গড়ে তুলে সত্যের দুর্গম পর্বত,
নির্ভীক পথিক হয়ে পাড়ি দেয় পথ গন্তব্য খুঁজে পেতে।
অজয়কে জয় করার বিশ্বাস রেখে জাগায় মনে প্রত্যয়,
তাদের শিরা-উপশিরায় বয়ে চলে আগুন ঝরা রক্তের স্রোত।
বালিকা থেকে
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
বালিকার কিশোরী হওয়ার সুখ গড়িয়ে পড়ছে যৌবনে,
বর্ধিত মাংসপিণ্ড থেকে আসে তীরবিদ্ধ যন্ত্রণা।
রক্ত দেখে মূর্ছা যাওয়া একাদশী এখন রক্তের সম্পর্ক গড়ছে।
তার উদাস নয়নের চারপাশজুড়ে খেলা করে প্রেম প্রেম লুকোচুরি,
তরুণী অরুণ রাঙা আলোর মাঝে ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’।
চিকচিকে জলে একদিন ধারণ করেছে আগামীর ভবিষ্যৎ,
অথচ রক্তের সম্পর্ক আদৌ গড়ে ওঠেনি কিংবা
উঠবে কি না তা হয়তো যুবতীর জানা নেই।
নিঃশব্দ উপাসনা
ফেরদাউসী কুঈন
পরদিন সকালে মাঠে নেমে বুঝলাম—
শূন্যতাও দৃশ্যমান হতে পারে।
কোথাও কোনো জলপাই রঙের যান নেই,
কোনো বুটের শব্দ নেই,
কোনো ব্যস্ততা নেই।
শুধু বৃষ্টিভেজা মাটিগুলো
চাকার স্মৃতি বুকে নিয়ে
এবড়োখেবড়ো হয়ে পড়ে আছে।
মনে হলো,
চলে যাওয়ার পর মানুষ নয়,
চিহ্নগুলোই সবচেয়ে বেশি কথা বলে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা