গাজা উপত্যকায় হামাসের অস্ত্র হস্তান্তরের ঘোষণার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন এক বড় কূটনৈতিক বিজয়ের আমেজে ভাসছেন, তখন এর ঠিক বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে এক চরম রাজনৈতিক দোলাচলের মুখোমুখি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। আপাতদৃষ্টিতে গাজার নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে ফিলিস্তিনি অবরুদ্ধ এলাকা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং পর্যায়ক্রমে ফিলিস্তিনি প্রশাসনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের শর্ত অন্তর্ভুক্ত থাকলেও, প্রশ্ন থেকে যায়— ইসরায়েল কী সত্যিই গাজা থেকে পুরোপুরি সরে আসতে প্রস্তুত, নাকি এটি স্রেফ একটি রাজনৈতিক কুশলতা?
প্রকৃতপক্ষে, এই চুক্তির শর্তগুলো ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জনগণের মানসিকতার একদম বিপরীত। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ বিধ্বংসী যুদ্ধ ও গণহত্যা গাজার প্রায় ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির প্রাণ নিলেও, ইসরায়েলি সমাজের একটি বিশাল অংশ এখনো ফিলিস্তিনিদের প্রতি প্রচণ্ড কঠোর অবস্থান ধরে রেখেছে।
সাম্প্রতিক একাধিক জরিপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ ইহুদি ইসরায়েলি গাজা তো বটেই, এমনকি ইসরায়েলে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদেরও জোরপূর্বক বিতাড়নের পক্ষে। এমন এক পরিস্থিতিতে গাজা থেকে সেনা সরিয়ে আনা কিংবা সেখানকার পুনর্বাসনে রাজি হওয়া যেকোনো ইসরায়েলি রাজনীতিবিদের জন্যই ‘নির্বাচনী আত্মহত্যা’র শামিল।
ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের মতো জোট অংশীদারা ইতোমধ্যেই এই চুক্তিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এমনকি মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিত বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটও এই চুক্তির সামরিক কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর সংশয় প্রকাশ করেছেন।
দুর্নীতির একাধিক মামলায় কারাদণ্ড এড়ানোর জন্য আসন্ন অক্টোবরের নির্বাচনে জয়লাভের ওপর নির্ভরশীল নেতানিয়াহুর জোট টিকিয়ে রাখা এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। আবার অন্যদিকে, নির্বাচনে প্রধান মিত্র ট্রাম্পের সমর্থন ধরে রাখতে মার্কিন প্রশাসনের এই নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি অস্বীকার করাও তার পক্ষে অসম্ভব।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, নেতানিয়াহু আসলে এক সুচতুর দ্বিমুখী কৌশল অবলম্বন করতে যাচ্ছেন। তিনি একদিকে ট্রাম্পকে খুশি রাখতে প্রচারণামূলক পদক্ষেপ ও আংশিক, প্রতীকী সেনাসরানোর অভিনয় জারি রাখবেন; অন্যদিকে কট্টরপন্থী ভোটারদের সন্তুষ্ট রাখতে মূল গাজা উপত্যকা থেকে বাস্তবিক অর্থে সেনা প্রত্যাহার এড়িয়ে যাবেন।
দীর্ঘমেয়াদে গাজায় নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখা কেবল নেতানিয়াহুর ক্ষমতার রাজনীতি নয়, বরং তার রাজনৈতিক দর্শনেরও মূল ভিত্তি। ফলে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে কোনো শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের চেয়ে গাজা ইস্যুতে সামরিক উত্তেজনা জিইয়ে রাখা এবং অভ্যন্তরীণ জনমতকে উসকে দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
সময়ের আলো/জেডি