বাংলাদেশের স্বাধীনতাযাত্রায় সঙ্গী হয়েছিল যে গানের জোয়ার

সময়ের আলো ডেস্ক

ফিচার

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামে রাষ্ট্র পেতে মুক্তিকামী মানুষ যখন এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, তখন সাত সমুদ্র তেরো নদী

2026-08-01T18:56:14+00:00
2026-08-01T18:56:14+00:00
 
  শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬,
১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
ফিচার
কনসার্ট ফর বাংলাদেশ
বাংলাদেশের স্বাধীনতাযাত্রায় সঙ্গী হয়েছিল যে গানের জোয়ার
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ৬:৫৬ পিএম 
সময়ের আলো কোলাজ।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামে রাষ্ট্র পেতে মুক্তিকামী মানুষ যখন এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, তখন সাত সমুদ্র তেরো নদী ওপারের এক জনাকীর্ণ স্টেডিয়াম থেকে ভেসে এসেছিল এক সুরের জোয়ার, যা বিশ্ববিবেকের দরজায় কড়া নেড়েছিল। ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে আয়োজিত ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ কেবল একটি সংগীতানুষ্ঠান ছিল না, বরং এটি ছিল একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্মের নেপথ্যে সুরের এক অভূতপূর্ব কূটনৈতিক সংগ্রাম।

রবিশঙ্কর ও জর্জ হ্যারিসনের সেই আত্মিক বন্ধন

এই সুরের যুদ্ধের মূলে ছিলেন কিংবদন্তি সেতার বাদক পণ্ডিত রবিশঙ্কর। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোর জেলার নড়াইলে ছিল তার পৈতৃক ভিটা। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে পরিকল্পিত গণহত্যা শুরু করে, তখন অগুনতি মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। নিজ শেকড়ের এই আর্তনাদ রবিশঙ্করকে ব্যথিত করে। তিনি তার প্রিয় বন্ধু, সাবেক বিটলস সদস্য জর্জ হ্যারিসনের কাছে এই মানবিক বিপর্যয়ের কথা তুলে ধরেন এবং একটি তহবিল সংগ্রহের আবেদন করেন। জর্জ হ্যারিসন দ্রুত সাড়া দেন এবং সিদ্ধান্ত নেন এটি কেবল একটি সাধারণ অনুষ্ঠান হবে না, বরং হবে বিশ্ববাসীর জন্য এক শক্তিশালী বার্তা।

‘বাংলাদেশ’ গানের সেই অবিনাশী সুর

কনসার্টের আগেই জর্জ হ্যারিসন মাত্র দশ মিনিটে পিয়ানোতে বসে লিখে ফেলেন তার ঐতিহাসিক একক গান ‘বাংলাদেশ’। গানের কথাগুলো ছিল সরাসরি এক বন্ধুর আর্তি : ‘My friend came to me with sadness in his eyes / Told me that he wanted help before his country dies।’ সেই সময় পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ শব্দটি ব্যবহার করা হলেও, হ্যারিসন এবং রবিশঙ্কর সচেতনভাবে তাদের গানে ও কনসার্টে ‘বাংলাদেশ’ নামটি ব্যবহার করেন, যা বিশ্ব মানচিত্রে এই নতুন দেশের অস্তিত্বকে জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।


ম্যাডিসন স্কয়ারে সুরের মহামিলন

১৯৭১ সালের ১ আগস্ট নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে দুটি শো-তে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের সামনে পারফর্ম করেন বিশ্বসংগীতের রথী-মহারথীরা। অনুষ্ঠানে রবিশঙ্কর ও আলি আকবর খান পরিবেশন করেন ‘বাংলা ধুন, যা ছিল বাংলাদেশের লোকজ সুরের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এক রাগ। এরপর মঞ্চে আসেন জর্জ হ্যারিসন, বব ডিলান, রিংগো স্টার, এরিক ক্ল্যাপটন এবং লিওন রাসেলের মতো তারকারা। বিশেষ করে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পর দীর্ঘদিনের নিভৃতবাস ভেঙে বব ডিলানের মঞ্চে ফেরা ছিল এক অভাবনীয় ঘটনা। তিনি গেয়েছিলেন তার বিখ্যাত ‘A Hard Rain's Gonna Fall’, যা যুদ্ধের ধ্বংসলীলার কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছিল।


বিদ্রোহী সুরের ঝংকার : জোয়ান বায়েজ ও অ্যালেন গিন্সবার্গ

একই সময়ে লোকসংগীতের সম্রাজ্ঞী জোয়ান বায়েজ লিখেছিলেন ‘Song of Bangladesh’। তার গানে ফুটে উঠেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ওপর চালানো নৃশংস হত্যাযজ্ঞের করুণ চিত্র। অন্যদিকে, বিট প্রজন্মের কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ যশোরের সেই ঐতিহাসিক সড়ক ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় প্রত্যক্ষ করেন উদ্বাস্তুদের সীমাহীন কষ্ট। তার সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা কালজয়ী কবিতা ও গান ‘September on Jessore Road’ বিশ্ববাসীর কাছে এক মানবিক দলিল হয়ে দাঁড়ায়। 


ইতিহাস ও ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার

এই কনসার্ট থেকে অর্জিত অর্থ ইউনিসেফের মাধ্যমে বাংলাদেশি শরণার্থীদের সহায়তায় ব্যবহৃত হয়। ১৯৮৫ সাল নাগাদ এই উদ্যোগ থেকে প্রায় ১২ মিলিয়ন ডলার ত্রাণ হিসেবে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল। তবে আর্থিক মূল্যের চেয়েও এর রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। তৎকালীন মার্কিন সরকারের পাকিস্তান ঘেঁষা অবস্থানের বিপরীতে মার্কিন তরুণ সমাজ ও বিশ্ব জনমতকে বাংলাদেশের পক্ষে আনতে এই সুরের জোয়ার অসামান্য ভূমিকা রেখেছিল।


বাংলাদেশ রাষ্ট্রযাত্রার সেই উত্তাল দিনগুলোতে সংগীত কেবল বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, বরং তা হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার অন্যতম হাতিয়ার। আজ পঞ্চাশ বছর পরেও ম্যাডিসন স্কয়ারের সেই গিটারের ঝংকার বা সেতারের আলাপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়— একটি জাতির ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামে প্রাচ্য আর পাশ্চাত্য কীভাবে এক সুরের মোহনায় মিলিত হতে পারে।

সময়ের আলো/জেডি 


  বিষয়:   বাংলাদেশ  স্বাধীনতাযাত্রা  সঙ্গী  দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ  জর্জ হ্যারিসন  পণ্ডিত রবিশঙ্কর 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: