গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে লটারির মাধ্যমে গণপূর্ত অধিদফতরের ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে (সিভিল) একযোগে বদলির ঘটনায় সংস্থাটির প্রকৌশলীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। একই পদ্ধতিতে পর্যায়ক্রমে অন্য কর্মকর্তাদেরও দ্রুত বদলি করা হবে- এমন খবরে তিন শতাধিক উপসহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) এবং ছয় শতাধিক সহকারী প্রকৌশলী ও উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর মধ্যেও বদলি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
একাধিক প্রকৌশলী জানান, শিক্ষাবর্ষের মাঝামাঝি সময়ে আকস্মিক বদলির কারণে অনেক কর্মকর্তার সন্তানের লেখাপড়া ব্যাহত হতে পারে। তাদের দাবি, লটারির উদ্দেশ্য যদি স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও বৈষম্যহীন বদলি নিশ্চিত করা হয়, তবে একই নীতি শুধু উপসহকারী প্রকৌশলীদের ক্ষেত্রে নয়, অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের প্রকৌশলীর পদায়নের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রয়োগ করা উচিত।
গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় পূর্ত ভবনের সম্মেলন কক্ষে দেশের আটটি বিভাগের ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলীর পদায়নের স্থান ও শাখা লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। লটারির ফলাফলের ভিত্তিতে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন কার্যালয়ে ৩১৭ জন, রাজশাহী বিভাগে ৭৩ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৩৩ জন, খুলনা বিভাগে ৭৪ জন, বরিশাল বিভাগে ৪৪ জন, সিলেট বিভাগে ৩৩ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ২৯ জন এবং রংপুর বিভাগে ৬৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে পদায়ন করা হয়।
প্রকৌশলীদের একটি বড় অংশের দাবি, এ ধরনের পদ্ধতি বিদ্যমান বদলি নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এতে ‘চেইন অব কমান্ড’ দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি দাফতরিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, মন্ত্রণালয় সস্তা জনপ্রিয়তার পেছনে ছুটতে গিয়ে পুরো অধিদফতরে বৈষম্যের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
প্রকৌশলীদের অভিযোগ, লটারিভিত্তিক বদলির ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও স্বাস্থ্যগত বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। চাকরিজীবী স্বামী-স্ত্রীকে একই কর্মস্থল বা নিকটবর্তী এলাকায় পদায়নের নীতিমালাও অনুসরণ করা হয়নি। আবার অধিকাংশ কর্মকর্তাকে নিজ জেলার আশপাশে পদায়ন করা হলেও কিছু কর্মকর্তাকে দূরবর্তী জেলায় পাঠানো হয়েছে, যা বৈষম্য সৃষ্টি করেছে বলে তাদের দাবি।
এ ছাড়া একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক প্রকৌশলীর বদলি প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলেও এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি, সময় এবং সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বদলির ক্ষেত্রে কোনো সুস্পষ্ট, প্রকাশিত ও অভিন্ন নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না তা পরিষ্কার নয়। মাত্র এক মাস আগে যাদের বদলি করা হয়েছে, তাদের নামও পুনরায় লটারিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
তাদের মতে, বছরের মাঝামাঝি সময়ে আকস্মিক বদলির কারণে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সন্তানের শিক্ষাজীবন, পারিবারিক পরিকল্পনা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত হতে পারে। তাই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মানবিক বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
গণপূর্ত অধিদফতরের আওতাধীন বাংলাদেশ সচিবালয়, বঙ্গভবন, জাতীয় সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সরকারি বাসভবন, রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও বাসভবনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভিভিআইপি স্থাপনার পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং জরুরি মেরামতের কাজ অত্যন্ত অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের ওপর নির্ভরশীল। একাধিক প্রকৌশলীর আশঙ্কা, একই সময়ে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তার বদলির ফলে এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার চলমান কার্যক্রমে সাময়িক বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে।
প্রকৌশলীরা বদলির জন্য একটি সুস্পষ্ট ও লিখিত নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রকাশ, অযৌক্তিকভাবে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একই কর্মকর্তাকে পুনরায় বদলির আওতায় না আনা এবং শিক্ষাবর্ষের মাঝামাঝি সময়ে ব্যাপক বদলি এড়িয়ে মানবিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় সেবা অব্যাহত রাখতে পরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে বদলি কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা ও সমতার নীতি যদি অনুসরণ করা হয়, তবে তা অধিদফতরের সব স্তরের কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
প্রকৌশলীদের কেউ কেউ আরও বলেন, গ্রেডেশন তালিকার শীর্ষ পাঁচজন যোগ্য কর্মকর্তার মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে প্রধান প্রকৌশলী নির্বাচন করা হলে প্রক্রিয়াটির নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা সম্পর্কে জনমনে আরও আস্থা সৃষ্টি হতে পারে। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী সিভিল ক্যাডারের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীদের মধ্য থেকে তিনজন এবং ই/এম ক্যাডার থেকে দুজন- মোট পাঁচজনকে নিয়ে লটারির মাধ্যমে প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগ করা হলে বৈষম্য ও উৎকোচ উভয়ই কমবে।
পাশাপাশি এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচন বা পদায়নের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা, যোগ্যতার মানদণ্ড এবং জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছেন একাধিক প্রকৌশলী।
এ বিষয়ে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সারোয়ার আলম বলেন, লটারির মাধ্যমে বদলি কার্যক্রম পরিচালনার ফলে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় একটি কার্যকর, আধুনিক ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতির সূচনা হলো।
গণপূর্ত অধিদফতরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. ফিরোজ হাসান বলেন, প্রথমবারের মতো এ ধরনের লটারিভিত্তিক বদলি কার্যক্রম প্রকৌশলীদের মধ্যে আস্থা, সমতা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সময়ের আলো/এসএকে