জীবন চলার পথে রাগ, অভিমান বা মনোমালিন্য—একটি স্বাভাবিক সম্পর্কের অংশ। অনেকেই এমন পরিস্থিতিতে কিছু সময় চুপ থাকেন, ফোন ধরেন না বা বার্তার উত্তর দেন না। তবে এই নীরবতা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে কষ্ট দেওয়া, অপরাধবোধে ভোগানো বা নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটি আর সাধারণ অভিমান নয়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় সাইলেন্ট ট্রিটমেন্ট, যা অনেক ক্ষেত্রে মানসিক নির্যাতনের একটি রূপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
সাইলেন্ট ট্রিটমেন্ট হলো এমন একটি আচরণ, যেখানে একজন ব্যক্তি সচেতনভাবে অন্যজনের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই ফোন, বার্তা কিংবা মুখোমুখি কথোপকথন এড়িয়ে গিয়ে তিনি অপর ব্যক্তিকে অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপে রাখেন। এর ফলে উপেক্ষার শিকার ব্যক্তি নিজের কোনো ভুল না থাকলেও নিজেকেই দায়ী ভাবতে শুরু করেন। অনেক সময় সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য অকারণেই ক্ষমা চান বা বারবার অপর পক্ষের মন জয়ের চেষ্টা করেন। এতে সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট হতে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সুস্থ সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো যোগাযোগ। মতবিরোধ হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু সেই সমস্যার সমাধান যদি কথোপকথনের বদলে দীর্ঘ নীরবতার মাধ্যমে করা হয়, তাহলে ভুল বোঝাবুঝি ও মানসিক দূরত্ব বাড়তে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের পারডিউ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী কিপলিং উইলিয়ামসের গবেষণায় দেখা গেছে, কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হলে মস্তিষ্কের যে অংশটি সক্রিয় হয়, সেটি শারীরিক ব্যথার সময়ও সক্রিয় থাকে। অর্থাৎ, প্রিয় মানুষের নীরবতা অনেক সময় শারীরিক আঘাতের মতোই মানসিক কষ্টের অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে অকারণে দোষারোপ করা উচিত নয়। বারবার ফোন বা বার্তা দিয়ে অপর পক্ষের মনোযোগ পাওয়ার চেষ্টার বদলে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার অপেক্ষা করা ভালো। পরে খোলামেলা আলোচনা করে জানিয়ে দেওয়া প্রয়োজন যে মতবিরোধ স্বাভাবিক, কিন্তু নীরবতা দিয়ে শাস্তি দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। একই আচরণ বারবার ঘটলে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা এবং প্রয়োজন হলে মনোবিজ্ঞানী বা সম্পর্কবিষয়ক কাউন্সেলরের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ভালোবাসার সম্পর্কে অভিমান থাকতেই পারে, কিন্তু সেই অভিমান যদি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যকে কষ্ট দেওয়ার অস্ত্রে পরিণত হয়, তাহলে তা আর ভালোবাসার ভাষা থাকে না। সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি পারস্পরিক সম্মান, আস্থা ও খোলামেলা যোগাযোগ। কারণ অনেক সময় উচ্চস্বরে বলা কঠিন কথার চেয়েও দীর্ঘ নীরবতা মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে।
সময়ের আলো/এসএকে