জুলাইয়ের পথে থামে না মিছিল

শাহনেওয়াজ

জাতীয়

ফরাসি দার্শনিক আলবেয়ার কামুর একটি উক্তি হচ্ছে, ‘বিদ্রোহ হচ্ছে মানুষের অস্তিত্বশীলতার প্রশ্ন। বিদ্রোহ করি বলেই আমরা টিকে থাকি’। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও

2026-08-05T00:28:30+00:00
2026-08-05T00:28:30+00:00
 
  বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬,
২১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
অভ্যুত্থানের ২ বছর
জুলাইয়ের পথে থামে না মিছিল
শাহনেওয়াজ
প্রকাশ: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২৮ এএম 
প্রচ্ছদ : হামীম কেফায়েত
ফরাসি দার্শনিক আলবেয়ার কামুর একটি উক্তি হচ্ছে, ‘বিদ্রোহ হচ্ছে মানুষের অস্তিত্বশীলতার প্রশ্ন। বিদ্রোহ করি বলেই আমরা টিকে থাকি’। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা। হাসিনা যুগের কর্তৃত্ববাদী শাসনে পিষ্ট দেশের সব ধর্ম-বর্ণ, লিঙ্গ ও শ্রেণিপেশার মানুষ অস্তিত্বের প্রয়োজনেই বিদ্রোহে শামিল হয়েছিল। 

জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ শুধু একটি সরকারের পতনের ইতিহাস নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নাগরিক মর্যাদার সম্পর্ক। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, একটি রায় কেন্দ্র করে দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী সরকারের পতন হয়। রায়টি নিজে সরকারের পতন ঘটায়নি। এ রায় ঘিরে রাজনৈতিক বিস্ফোরণের সূচনা হয়। 

প্রায় ১৭ বছর ধরে বাংলাদেশ এমন এক ধরনের শাসনের অধীনে ছিল, যা গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত করে ফেলেছিল। নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়েছিল। ফলে সংসদ তার বিতর্কের মঞ্চ হিসেবে প্রাণশক্তি হারিয়েছিল। একটি বিশ্বাসযোগ্য সংসদের অনুপস্থিতিতে নাগরিকদের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকেনি। 

ফরাসি উপনিবেশের কঠোর বিরোধী ও বিখ্যাত চিন্তাবিদ ফ্রানৎস ফানো মনে করতেন, কোনো নির্দিষ্ট সংস্কৃতি নয় বরং নানা কারণেই মানুষ বিদ্রোহ করে, যখন মানুষের দম বন্ধ হয়ে ওঠার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। যখন দমনমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা একটি জনগোষ্ঠীর আশা ও স্বপ্ন দাবিয়ে রাখে তখন সেই জনগোষ্ঠী বিদ্রোহকে জীবনের স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত পথ হিসেবে বেছে নেয়। 

হাসিনা সরকারের দীর্ঘদিনের কর্তৃত্বতান্ত্রিক শাসন সৃষ্টি করেছিল চরম বৈষম্য আর বঞ্চনা। কায়েম করা হয়েছিল পুলিশি রাষ্ট্র, গুম, খুন, অর্থ পাচার ও ত্রাসের রাজত্ব। লাগাম টানা হয়েছিল গণমাধ্যম ও জনগণের মত প্রকাশের অধিকারের। তীব্র আঘাত এসেছিল জান ও জবানের স্বাধীনতায়। চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছিল নাগরিকের মর্যাদা। এ কারণেই বৈষম্য আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল ২০২৪-এর জুলাইয়ে। তাই গণবিদ্রোহের পথ ধরে ঘটেছিল গণবিস্ফোরণ। বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই এসেছিল তরুণদের দৃপ্ত শপথে। অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছিল ক্যাম্পাস আর রাজপথ। 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অনুঘটক ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই শেখ হাসিনা সরকারের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত গণপ্রতিরোধে রূপ নেয়। রাজপথে নেমে আসা মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় প্রতিবাদী সেøাগান, চোখে-মুখে ফুটে ওঠে নিপীড়ন ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের দৃঢ় প্রত্যয়।

স্বৈরাচারবিরোধী এই আন্দোলনে নারী-পুরুষের পাশাপাশি অংশ নেন হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্যরাও। শহর থেকে গ্রাম, বাঙালি থেকে আদিবাসী, তরুণ থেকে প্রবীণ, পথশিশু, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বুদ্ধিজীবী, রিকশাচালক, শ্রমিক, ব্যাংকার, সাংবাদিক ও বিভিন্ন পেশার মানুষ এতে যুক্ত হন। ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শিক বিভাজন অতিক্রম করে এই অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ মানুষে মানুষে সংগ্রামের বিরল ঐক্য গড়ে তোলে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা ছিল দুটি। প্রথমত স্বৈরাচার হটানো; দ্বিতীয়ত বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। এই দুই আকাক্সক্ষা মূর্ত হয়েছিল গণঅভ্যুত্থানকালীন বক্তৃতা, স্লোগান, পোস্টার, গ্রাফিতি প্রভৃতিতে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিও আন্দোলনের অন্যতম প্রধান এজেন্ডায় পরিণত হয়। প্রশ্ন হচ্ছে- কীভাবে কোটা সংস্কারের আন্দোলন একটি সফল গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিল? এর উত্তর খুঁজতে ফিরে যেতে হয় আন্দোলনের পূর্বাপর ইতিহাসে।

২০১৩ সালেও কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন হয়েছিল। তবে সরকার বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তা দমন করে। ২০১৮ সালে আবারও শিক্ষার্থীরা একই দাবিতে রাজপথে নামেন। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ওই বছরের ৪ অক্টোবর সরকার নবম থেকে ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা বাতিল করে পরিপত্র জারি করে। পরে ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারির আগে আরেকটি পরিপত্রের মাধ্যমে অষ্টম গ্রেড ও তার ঊর্ধ্বতন পদেও কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়। কিন্তু ওই পরিপত্রের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২১ সালে সাতজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান উচ্চ আদালতে রিট করেন। 

এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট ২০১৮ সালের পরিপত্র বাতিল ঘোষণা করলে পূর্বের কোটাব্যবস্থা কার্যত পুনর্বহাল হয়। এই রায় কেন্দ্র করেই নতুন করে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা, যা একপর্যায়ে সফল গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।

তবে আন্দোলনের মোড় ঘুরে যায় ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই। চীন সফর শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘তা হলে কি রাজাকারের নাতি-নাতনিরা চাকরি পাবে?’ তার এই মন্তব্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্মের হাজারো শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে স্লোগান তোলে- ‘তুমি কে, আমি কে? রাজাকার, রাজাকার’ এবং ‘কে বলেছে, কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার।’ এর মধ্য দিয়েই কোটা আন্দোলন স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়।

স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পরিচালনার তিনটি প্রধান এজেন্ডা ছিল- বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। এর মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কারকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। এ লক্ষ্যে প্রথমে পাঁচটি এবং পরে আরও পাঁচটি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। প্রত্যাশা ছিল- অন্তর্বর্তী সরকার অন্তত সংস্কার প্রক্রিয়ার একটি শক্ত ভিত তৈরি করবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। 

প্রতিটি কমিশন তাদের সুপারিশ জমা দিলেও অধিকাংশ সুপারিশ বাস্তবায়নের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা বাড়াতে অন্তর্বর্তী সরকার দুটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয় সংসদে সেগুলোর বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। যদিও সরকার দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের সার্চ কমিটি গঠন করেছে।

সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠনের উদ্দেশ্যে অধ্যাদেশ জারি হলেও এখনও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল- বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে আরও জবাবদিহির আওতায় আনা।

অন্যদিকে পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাহিনীর কাঠামোগত পরিবর্তন, প্রশিক্ষণব্যবস্থা, কর্মপরিবেশ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদার পুলিশব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি সামনে আসে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। অথচ ৫ আগস্টের পর রাজারবাগে পুলিশের ১১ দফা দাবির প্রথমটিই ছিল- পুলিশকে যেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা না হয়।

পুলিশ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সদ্য বিদায়ি অতিরিক্ত আইজিপি ড. মো. আশরাফুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ক্রসফায়ার, নির্যাতন ও দুর্নীতির মতো নানা অভিযোগে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে রাজধানীর মীর হাজারীবাগ এলাকায় ঢাকা সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী বিকাশ চন্দ্র দাসকে মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে এক পুলিশ সদস্য বলেছিলেন, ‘মাছের রাজা ইলিশ, দেশের রাজা পুলিশ।’ এই উদ্ধত মানসিকতা সময়ের সঙ্গে আরও প্রকট হয়। 

পরবর্তী সময়ে ক্রসফায়ার, গুম, নির্যাতন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো অসংখ্য অভিযোগে পুলিশের নাম জড়িয়েছে। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করতে সরকার প্রধানত পুলিশের ওপর নির্ভর করেছিল। একইভাবে ২০১৮ সালের বহুল আলোচিত রাতের ভোটেও পুলিশ ছিল রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। পুরো নিপীড়নের কেন্দ্রবিন্দু ছিল পুলিশ। এই সংস্কৃতি শুধু রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; সাধারণ নাগরিকও এর শিকার হয়েছেন। জাতীয় ক্রিকেটার নাইম হাসানকেও একসময় অটোরিকশা থেকে নামিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছিল পুলিশের বিরুদ্ধে। 


অবশ্য ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর কিছু সময়ের জন্য পুলিশের আচরণে সংযম লক্ষ করা গিয়েছিল। কিন্তু সেই পরিবর্তন স্থায়ী হয়নি। ফলে পুলিশ সংস্কার এখন শুধু নাগরিক সমাজের দাবি নয় বরং একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের পূর্বশর্ত। বিশেষ করে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স কেন্দ্র করে পুলিশ সংস্কারের দাবি নতুন করে জোরালো হয়ে ওঠে। 

এ প্রেক্ষাপটে একটি স্বাধীন ও কার্যকর পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পুলিশের জবাবদিহি, কাঠামোগত সংস্কার ও পেশাগত মানোন্নয়নের জন্য এ ধরনের কমিশন বা স্বাধীন তদারকিব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশেও জনআস্থা পুনরুদ্ধার এবং একটি পেশাদার, জবাবদিহিমূলক পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে এমন উদ্যোগ সময়ের দাবি।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, রাষ্ট্রের প্রায় সব খাতেই সংস্কার প্রয়োজন। তার মতে, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তন সম্ভব, যা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 


  বিষয়:   জুলাই  পথ  মিছিল  গণ-অভ্যুত্থান 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: