টানা প্রায় সাড়ে ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২৩ দিনের প্রচণ্ড ও রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মুখে পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে বঙ্গভবন থেকে সামরিক হেলিকপ্টারে বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে ভারতে পাড়ি জমান। ২০০৮ সালে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসলেও পরবর্তী সাড়ে ১৫ বছরে কোনো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না দেওয়া, ভোটাধিকার হরণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছিল সাধারণ মানুষ। অবকাঠামোগত উন্নয়নের আড়ালে রিজার্ভ সংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সেই ক্ষোভকে আরও উসকে দেয়।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ১ জুলাই ২০২৪ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন ১৪ জুলাই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিতর্কিত বক্তব্য এবং শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকার’ গালি দেওয়ার প্রেক্ষাপটে পুরো দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ১৫ জুলাই ছাত্রলীগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হামলা এবং ১৭ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে দেশব্যাপী দাবানলের সৃষ্টি হয়।
১৯ জুলাই সারাদেশে 'শুট অন সাইট' বা দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দিয়ে সরকার নির্মম দমনপীড়নে নামে। শিশু, কিশোরী, পথচারীসহ প্রায় দুই শতাধিক মানুষ প্রাণ হারালে সর্বস্তরের মানুষ আন্দোলনে সংহতি জানান। ১০ হাজারের বেশি মানুষকে গণগ্রেপ্তার ও সমন্বয়কদের ডিবি কার্যালয়ে আটকে রেখে জোড়পূর্বক আন্দোলন প্রত্যাহারের চেষ্টা করা হলেও তা হবুচন্দ্র কৌশলের মতো ব্যর্থ হয়।
৩ আগস্ট শহিদ মিনারের জনসমুদ্র থেকে ৯ দফা রূপ নেয় এক দফা দাবিতে— শেখ হাসিনার পদত্যাগ। ৪ আগস্ট আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের রাজপথে নামিয়ে শেষ চেষ্টা চালানো হলে সংঘর্ষে ১১৪ জন নিহত হন, কিন্তু ছাত্র-জনতার উত্তাল প্রতিরোধের মুখে তারা টিকতে পারেনি।
৫ আগস্ট সকালে হাজার হাজার মানুষ 'মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচিতে সাড়া দিয়ে রাজপথে নেমে আসেন। পুলিশ ও সেনাবাহিনী গুলি চালানো বন্ধ করলে এবং দুপুরের দিকে সেনাপ্রধানের বক্তব্যের আগাম বার্তায় লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে বিজয়ের উল্লাসে মেতে ওঠে। বেলা আড়াইটায় শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর এলে উন্মুক্ত জনস্রোত গণভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঢুকে পড়ে।
বায়ান্ন, ঊনসত্তর কিংবা নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানকে ছাপিয়ে যাওয়া এই আন্দোলনের মূল নায়ক ছিল জেন জি প্রজন্ম এবং নারী সমাজের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ। ফেসবুক, টিকটক ও এক্স-কে প্রধান হাতিয়ার বানিয়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্য দিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে দেশের চিত্র তুলে ধরে তরুণ সমাজ।
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার সীমাহীন অহংকার, একগুঁয়েমি ও দম্ভের কারণে দীর্ঘ সাড়ে তিন শতাধিক তাজা প্রাণের বিনিময়ে আওয়ামী লীগ আজ ইতিহাসের গভীরতম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
সময়ের আলো/জেডি