কোটা থেকে সরকার পতন : যেভাবে জুলাই অভ্যুত্থান পাল্টে দিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র

জাতীয়

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ তখন ছুটছেন গণভবনমুখী। কোথাও উল্লাস, কোথাও অনিশ্চয়তা, আবার কোথাও

2026-08-05T09:32:59+00:00
2026-08-05T09:34:13+00:00
 
  বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬,
২১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
কোটা থেকে সরকার পতন : যেভাবে জুলাই অভ্যুত্থান পাল্টে দিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র
প্রকাশ: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৩২ এএম  আপডেট: ০৫.০৮.২০২৬ ৯:৩৪ এএম
সংগৃহীত ছবি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ তখন ছুটছেন গণভবনমুখী। কোথাও উল্লাস, কোথাও অনিশ্চয়তা, আবার কোথাও সংঘর্ষের আশঙ্কা। সেনাপ্রধানের জাতির উদ্দেশে ভাষণের ঘোষণা এবং ইন্টারনেট সংযোগ ফেরার পর স্পষ্ট হয়ে যায়, টানা প্রায় সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটেছে। দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন শেখ হাসিনা। যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রবেশ করে এক নতুন অধ্যায়ে— যে পরিবর্তনের সূচনা করতে দীর্ঘ আন্দোলন ও জেল-জুলুম সহ্য করেও ব্যর্থ হয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলো।

৩৬ জুলাইয়ের অভ্যুত্থান ও ঐতিহাসিক পটভূমি

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলন সফল পরিসমাপ্তি ঘটায়, যা আন্দোলনকারীদের কাছে ‘৩৬ জুলাই’ হিসেবে পরিচিত। মাসখানেকের ব্যবধানে একটি অরাজনৈতিক আন্দোলন কীভাবে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক চরিত্র ধারণ করে সরকারের পতন ঘটাবে, তা ছিল কল্পনার বাইরে। তবে এই পরিণতি একদিনে আসেনি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিতর্কিত নির্বাচন, গুম-খুন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, অর্থনৈতিক চাপ এবং সীমাহীন দুর্নীতির জেরে গড়ে ওঠা সুপ্ত অসন্তোষই কোটা সংস্কার আন্দোলনের হাত ধরে রূপ নেয় নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানে।

১৯৬৯ বা ১৯৯০-এর ঐতিহাসিক আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের এই অভ্যুত্থানের মূল চালিকাশক্তি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা, যার সঙ্গে পরে যুক্ত হয় আপামর জনসাধারণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী মনে করেন, এই অভ্যুত্থান ছিল একটি ‘অর্গানিক বা স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলন’, যার প্রকৃত গতিপ্রকৃতি সরকার বুঝতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল।

কোটা আন্দোলন থেকে এক দফার স্ফুলিঙ্গ

২০০৯ সালের পর থেকে টানা চার মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকার অবকাঠামোগত মেগা প্রজেক্টে মনোযোগী হলেও বাক-স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ক্ষেত্র সংকুচিত করে ফেলে। বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত ও ডামি নির্বাচন দেশকে গভীর রাজনৈতিক বিভাজনে ফেলে দেয়। 

২০২৪ সালের জুনে কোটা পুনর্বহালসংক্রান্ত আদালতের একটি রায়কে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি মোড় নেয়। পরদিন ক্যাম্পাসে আন্দোলনকারীদের ওপর হওয়া নৃশংস হামলা ও দেশজুড়ে বাড়তে থাকা প্রাণহানির ঘটনা জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। সাধারণ মানুষ, শিক্ষক, অভিভাবক ও পেশাজীবীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে আসেন। আন্দোলন কেবল কোটা সংস্কারে সীমাবদ্ধ না থেকে শেষ পর্যন্ত এক দফার দাবিতে রূপ নেয়।

৩ আগস্ট শহিদ মিনারে ঐতিহাসিক এক দফা ঘোষণা

জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে টার্নিং পয়েন্ট ছিল ৩ আগস্ট। সেদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার চত্বরে লাখো মানুষের জনসমুদ্র থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করা হয়। মূল সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ এবং অন্যান্য ছাত্রনেতার নেতৃত্বে এই সিদ্ধান্ত আন্দোলনের গতিপথ চিরতরে বদলে দেয়। ছাত্রশিবিরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সর্বাত্মক অংশগ্রহণে এই অসহযোগ আন্দোলন সরকার পতনের চূড়ান্ত ভিত্তি তৈরি করে।

মার্চ ফর ঢাকা ও ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক পালাবদল

আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বে আগস্টের শুরুতে ঘোষণা করা হয় ‘মার্চ ফর ঢাকা’ কর্মসূচি। পুলিশ ও প্রশাসনের ব্যারিকেড ভেঙে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ রাজধানীমুখী হন। ৫ আগস্ট সকালেই ঢাকা কার্যত জনসমুদ্রে পরিণত হয়। দুপুরের দিকে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজপথ দখলে নেয় উল্লসিত জনতা। 


ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের বক্তব্য ও আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্ট হয় যে জীবনের তাগিদেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। প্রাবন্ধিক হাসান ফেরদৌস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. এস এম আলী রেজার মতে, এই ঘটনা শুধু একটি সরকারের পতন নয়, বরং পুরোনো ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে দিয়ে এক নতুন গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে। তবে কাঙ্ক্ষিত সেই বাংলাদেশ গড়তে রাজনৈতিক ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সময়ের আলো/জেডি 


  বিষয়:   জুলাই অভ্যুত্থান  ইতিহাস  নতুন বাংলাদেশ 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: