জুলুমের বিরুদ্ধে জনতার বিজয়

আরিফ খান সাদ

ইসলাম

মহান আল্লাহ কখনো জুলুম সহ্য করেন না। অন্যায় ও অত্যাচারের শাস্তি পরকালে নির্ধারিত থাকলেও এর মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে দুনিয়াতেও তিনি

2026-08-05T10:13:28+00:00
2026-08-05T10:13:28+00:00
 
  বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬,
২১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬
ইসলাম
জুলুমের বিরুদ্ধে জনতার বিজয়
আরিফ খান সাদ
প্রকাশ: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ১০:১৩ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মহান আল্লাহ কখনো জুলুম সহ্য করেন না। অন্যায় ও অত্যাচারের শাস্তি পরকালে নির্ধারিত থাকলেও এর মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে দুনিয়াতেও তিনি জালেমের দৃষ্টান্তমূলক পতন ঘটিয়ে থাকেন। ইতিহাসের পাতায় ফেরাউন ও নমরুদের করুণ পরিণতি যেমন সত্য, তেমনি সাম্প্রতিককালে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি উদ্ধত ফ্যাসিবাদের লজ্জাজনক পতন। ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী ও আপসহীন আন্দোলনের মুখে সেই ফ্যাসিবাদী শক্তির পতনের পর আজ মুক্ত বাতাসে অর্জিত বিজয়ের সুফল উপভোগ করছে পুরো দেশ। এই দীর্ঘ ও রক্তস্নাত পথপরিক্রমায় দেশের আলেম সমাজ ও তৌহিদি জনতা রেখেছিলেন ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় ভূমিকা।

পৃথিবীর যখন-যেখানে জুলুম ও অবিচার মাথা চাড়া দিয়েছে, সেখানেই প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন আলেম সমাজ। বাংলাদেশের ইতিহাসেও আলেম সমাজ সবসময় মাজলুমের পক্ষে ও জালেমের বিপক্ষে আন্দোলন করে আসছে। বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সময়ও আলেম সমাজ দিয়েছে রক্তের নাজরানা। 

২০১৩ সালের শাপলা আন্দোলন, ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন- সবসময়ই আলেম সমাজ ছিলেন সম্মুখ সারিতে এবং রাজপথে রচনা করেছেন রক্তদানের ইতিহাস। আলেমদের রক্ত ঝরানোর ইতিহাস নতুন নয়। বদর, উহুদ, কারবালা থেকে শুরু করে শাপলা-জুলাই পুরোটা সময় প্রেরণা জুগিয়েছে ইসলামের মানবতাবোধের শিক্ষা। জুলাই আন্দোলনেও মানুষ রাজপথে নামাজ আদায় করেছে, ঘরে ঘরে নারীরা রোজা রেখেছে, দোয়া-মোনাজাত করেছে। অনেক মানুষ শহিদ হওয়ার তামান্না নিয়ে রাজপথে অংশগ্রহণ করেছেন। 

ইসলাম সব ধরনের জুলুম ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে এবং যৌক্তিক সংস্কারের পক্ষে। গত বছর জুলাই মাসে বৈষম্যের বিরুদ্ধে জুমার খুতবা দেওয়ায় চাকরি হারান অনেক আলেম। আন্দোলন ও আন্দোলনকারীদের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার কারণে চাকরিচ্যুত করা হয় ধানমন্ডি তাকওয়া মসজিদের খতিব মুফতি সাইফুল ইসলাম, ধানমন্ডি সায়েন্স ল্যাবরেটরি মসজিদের খতিব মুফতি শামসুদ্দোহা আশরাফি, মিরপুর সায়েন্স ল্যাবরেটরি মসজিদের খতিব মুফতি আরিফ বিন হাবিবদের মতো খ্যাতিমান আলেম-বক্তাসহ সারা দেশের অসংখ্য মসজিদের ইমাম ও খতিবদের। 

শারীরিকভাবেও নির্যাতন ও হেনস্থার শিকার হন অনেক ইমাম-খতিব। তবু তারা জুমার বয়ানে তুলে ধরেন ফেরাউনের জালেমের দাস্তান এবং বিশাল বাহিনীসহ লোহিত সাগরে ডুবে মৃত্যুবরণের করুণ পরিণতির শিক্ষা। আলেমরা মসজিদ-মাদরাসায় যেভাবে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান জানান দেন, জুলুম-অত্যাচারের বিরুদ্ধে কথা বলেন; তেমনি অনলাইনেও সর্বতোভাবে আন্দোলনের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

দেশের আলেম সমাজের সর্ববৃহৎ অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন ‘হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’। ২৪-এর জুলাই-আগস্ট মাসে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে ছাত্র-জনতার পাশে দাঁড়ায় হেফাজতে ইসলাম। তৎকালীন স্বৈরাচার সরকারের সব ধরনের ভয়-শঙ্কা উপেক্ষা করে আন্দোলনের সময় পাঁচটি সাহসী বিবৃতি প্রকাশ করে হেফাজতে ইসলাম। ১৮ জুলাই, ২০২৪ বৃহস্পতিবার হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে প্রথম বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। বিবৃতির শিরোনাম ছিল ‘কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালিয়ে ছয় শিক্ষার্থী হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’। 

একই দিনের আরেকটি বিবৃতি প্রকাশ করে হেফাজতে ইসলাম। এর শিরোনাম ছিল ‘আন্দোলনে শহিদদের জন্য সারা দেশে দোয়ার আহ্বান হেফাজতের’। তারপর ১ আগস্ট, ২০২৪ বৃহস্পতিবার প্রচারিত হেফাজতে ইসলামের বিবৃতির শিরোনাম ছিল ‘আগামীকাল বাদ জুমা দেশব্যাপী দোয়ার আহ্বান জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম’। 

এতে বলা হয়, ‘হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী দেশের চলমান উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে আগামীকাল বাদ জুমা দেশব্যাপী দোয়া করার আহ্বান জানিয়েছেন।’ ২ আগস্ট, ২০২৪ শুক্রবার আমিরে হেফাজত আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী স্বাক্ষরিত ও প্রচারিত বিবৃতির শিরোনাম ছিল ‘শহিদদের রক্তের পথ বেয়েই এ দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পাবে।’ ৪ আগস্ট, ২০২৪ রোববার হেফাজতে ইসলামের বিবৃতির শিরোনাম ছিল, ‘ছাত্র-জনতার এক দফার ডাকে সবাই ঢাকা চলুন’। এই ঘোষণায় রাজপথে নেমে আসে দেশের আলেম সমাজ, মাদরাসা শিক্ষার্থী এবং সবস্তরের ধর্মপ্রাণ মানুষ।

জুলাই অভ্যুত্থানে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা ছিল পুরোদস্তুর রণক্ষেত্র। সবস্তরের ছাত্র-জনতার সঙ্গে রাজপথে নেমে এসেছিল আলেম সমাজও। যাত্রাবাড়ী বড় মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা রিদওয়ান হাসান স্বৈরাচার সরকারের নির্মম গণহত্যা দেখে চুপ করে বসে থাকতে পারেননি। তিনি তার মুরুব্বি এবং অন্য আলেমদের সঙ্গে জরুরি পরামর্শ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে যাত্রাবাড়ীর রাজপথে সংহতি সমাবেশ আহ্বান করেন। 

৩ আগস্ট সকালে কাজলা পেট্রোল পাম্পের সামনে ‘সাধারণ আলেম সমাজ’ ব্যানারে দেশের পরিচিত আলেমদের নিয়ে সংহতি সমাবেশ করে এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সর্বাত্মক সংহতি প্রকাশ করে। জুলাই মাসের মধ্যবর্তী সময় থেকেই তার নেতৃত্বে যাত্রাবাড়ীর রাজপথে আলেম এবং মাদরাসার শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিয়েছিল, তবে নির্দিষ্ট ব্যানারে ছিল না। ৩ আগস্ট প্রকাশ্যে নিজস্ব ব্যানারে রাজপথে নামেন তারা। 

আন্দোলনের উত্তাল সময়ে যাত্রাবাড়ী বড় মাদরাসার শিক্ষার্থীরা ছাড়াও আশপাশের অন্যান্য মাদরাসার শিক্ষার্থীরা ব্যাপক অবরোধ গড়ে তোলে। জালেমের বুলেটের সামনে বুক পেতে দেয় অনেক আলেম ও মাদরাসার শিক্ষার্থী। এমন একজন বীর জুলাই যোদ্ধা শহিদ মাওলানা খুবাইব বিন আব্দুর রহমান (রহ.)। ৫ আগস্ট মধ্যদুপুরে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে দলে দলে পুলিশ বাহিনী বেরিয়ে আসে এবং প্রকাশ্যে নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। মাওলানা খুবাইবকে সেখানে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আহতাবস্থায় গুলি করে হত্যা করে যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ। বুকের তাজা রক্ত ঢেলে রাজপথ রাঙিয়ে দেওয়া এই বীর শহিদ আলেম যাত্রাবাড়ী কাজলার পাড়ে অবস্থিত জামেয়া ইব্রাহিমিয়া ইসহাকিয়া মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আব্দুর রহমান সাহেবের ছোট ছেলে। দাওরায়ে হাদিস শেষ করে এই মাদরাসাতেই ইফতা বিভাগে অধ্যয়ন করছিলেন। 

আওয়ামী লীগের শাসনামলে জুলুমের পক্ষে এবং ইসলামের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিল শাহবাগ। অপরদিকে জুলুমের বিপক্ষে এবং ইসলামের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল শাপলা। তাই শাপলা এবং শাহবাগ শব্দ দুটো নির্দিষ্ট জায়গার নাম ছাপিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি প্রতীকী ও রূপক অর্থবোধ শব্দ হিসেবে। বিপরীতমুখী দুই অবস্থান বোঝাতে শব্দ দুটো বহুল আলোচিত। জুলাই বিপ্লবে বিপরীতমুখী দুই স্রোত মিলিত হয়েছিল একই মোহনায়। ২ আগস্ট জুমার নামাজের পর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের চত্বর থেকে গণমিছিল শুরু হয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও আরেকটি মিছিল শুরু হয় এবং দুই মিছিল একই জায়গায় মিশে যায়। চার কিলোমিটার রাজপথ একাকার হয়ে যায়। 

তার আগের দিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে সমন্বয়ক ও মুখপাত্র আবদুল কাদের ঘোষণা করেন শুক্রবারের এই ‘প্রার্থনা ও ছাত্র-জনতার গণমিছিল’ কর্মসূচি। ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ‘গণহত্যা ও গণগ্রেফতারের প্রতিবাদে এবং শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে শুক্রবার মসজিদে জুমার নামাজ শেষে দোয়া, শহিদদের কবর জিয়ারত, মন্দির, গির্জাসহ সব উপাসনালয়ে প্রার্থনার আয়োজন এবং জুমার নামাজ শেষে ছাত্র-জনতার গণমিছিল অনুষ্ঠিত হবে।’


ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে ঘোষিত কর্মসূচিতে সাড়া দিয়ে রাজপথে নেমে আসেন দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ। বিপুলসংখ্যক মাদরাসার শিক্ষার্থী শামিল হয় প্রার্থনা মিছিলে। মিছিলে আরও যোগ দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, আইনজীবী, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক জগতের মানুষও। আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদি মুখোশ উদোম হয়ে যাওয়ায় সেদিন জুমার নামাজের পর মাথায় টুপি দিয়ে শাহবাগ অভিমুখী পদযাত্রায় অংশ নিয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান ব্যক্ত করেন সুশীল সমাজের অনেক পরিচিত মুখ। গণমাধ্যমকে তাদের স্পষ্ট বার্তা জানাতেও দেখা যায়।

প্রায় দুই হাজার শহিদ এবং ৩০ হাজার আহত ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ৫ আগস্ট, ২০২৪ সফল হয় গণঅভ্যুত্থান। স্বাধীন দেশে পরাধীনতার জাঁতাকলে নিষ্পেষিত জনগণ সেদিন দ্বিতীয়বার ফিরে পায় স্বাধীনতার স্বাদ। সারা দেশের মানুষ সেদিন একযোগে রাজপথে নেমে আসে এবং উদযাপন করে কেয়ামত পেরিয়ে পাওয়া বিজয়ের নেয়ামত। সে দিনটি ছিল মহররম মাসের ২৯ তারিখ, যে মাসে পতন হয়েছিল অতীতের এক জালেম ফেরাউনের। 

জাতি-ধর্ম-শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সবস্তরের মানুষের সঙ্গে আলেম-উলামা এবং মাদরাসার শিক্ষার্থীরাও। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, উত্তরা পয়েন্ট এবং দেশের বিভিন্ন জায়গায় এদিনও শহিদ হন অনেক আলেম ও মাদরাসার শিক্ষার্থী, যা শহিদ আলেমদের তালিকায় স্থান পেয়েছে। সবস্তরের সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাজপথে যেভাবে আলেম সমাজ অংশগ্রহণ করে, ঠিক অন্যদিকে দেশকে নতুনভাবে গড়তে বঙ্গভবনে মুসলিম জনতার প্রতিনিধিত্ব করেন মাওলানা মামুনুল হক, পীর সাহেব চরমোনাই এবং এক দল শীর্ষস্থানীয় আলেম। জুলাই অভ্যুত্থানে আলেমদের বহুমুখী অংশগ্রহণ ও অবদান দেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আলেম ও সাংবাদিক

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি  


  বিষয়:   জুলুম  বিরুদ্ধে  জনতা  বিজয় 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: