দুই বছর আগে যে ছেলেকে ঘিরে ছিল পরিবারের সব স্বপ্ন। আজ সেই ছেলে পরিবারের কাছে কেবল স্মৃতি। পটুয়াখালী সদর শহরের একটি ছোট্ট ভাড়া বাসার এক কোণে এখনও যত্নে রাখা আছে বিসিএস প্রস্তুতির কয়েকটি বই। যে বই হাতে নিয়ে একদিন বাবা-মায়ের কষ্ট ঘোচানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন হৃদয় চন্দ্র তরুয়া। আজ সেই বইগুলোই হয়ে আছে তার বাবার স্মৃতিচিহ্ন। মাঝে মাঝে সেই বইগুলোর দিকে তাকিয়ে বাবা রতন তরুয়া ভাবেন বাংলার জমিনে কি কখনো তার ছেলে হত্যার বিচার হবে?
হৃদয় চন্দ্র তরুয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। ছেলেকে হারানোর শোক আজও ভুলতে পারেনি তার পরিবার। একদিকে সন্তানের শূন্যতা, অন্যদিকে বিচার পাওয়ার অনিশ্চয়তা। এভাবেই কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছেন রতন তরুয়া।
কথা বলতে বলতেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের কাছে টাকা-পয়সা কিছুই চাই না। আমার সন্তান দেশের জন্য রক্ত ঝরিয়েছে। শুধু চাই, যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে তাদের বিচার হোক। তবে আমি সন্দিহান, বাংলার জমিনে আমার ছেলে হত্যার বিচার হবে কিনা।
পটুয়াখালীর রতন তরুয়া ও অর্চনা রাণীর সন্তান হৃদয় চন্দ্র তরুয়া। তিনি ২০০৩ সালের ৩রা এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। বাবা কাঠমিস্ত্রি, মা অন্যের বাসাবাড়িতে কাজ করতেন। গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার ঘটকের আন্দুয়া গ্রামে। তবে দীর্ঘদিন ধরে পরিবারটি জেলা সদরের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন।
পরিবারের আর্থিক অবস্থা কখনোই সচ্ছল ছিল না। দারিদ্র্যের মধ্যেই বড় হয়েছেন হৃদয়। পরিবারের অভাব তাকে দমাতে পারেনি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়ার পর নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতেন টিউশন করিয়ে। কখনো বাসে, কখনো শাটল ট্রেনে চড়ে শহরে গিয়ে একসঙ্গে দুই-তিনটি টিউশন করাতেন।
কেমন আছেন জানতে চাইলে হৃদয়ের বাবা বলেন, আমরা নিজের ঘরও করতে পারিনি। ও ছোটোবেলা থেকেই কষ্টের মধ্যে বড় হয়েছে। পরিবারের কষ্ট ও দেখেছে। আমি তাকে টাকা দিতে পারতাম না। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে নিজেই টিউশন করে পড়াশোনা চালাচ্ছিল।
তিনি বলেন, হৃদয়ের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল বিসিএস ক্যাডার হওয়ার। অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করে বিসিএস ক্যাডার হয়ে পরিবারের কষ্ট ঘোচাতে চেয়েছিল সে। বিসিএস দেওয়ার জন্য হৃদয় বই কিনেছিল। পড়াশোনাও শুরু করেছিল। বইগুলো এখনও আমার কাছে আছে। মাঝে মাঝে বইগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি। তখন খুব মনে হয়, যদি আমার ছেলেটা বেঁচে থাকত। আর আমার ছেলে হত্যার বিচার কি কখনো বাংলার জমিনে হবে?
একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন হৃদয়। আন্দোলনের শুরু থেকেই বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বহদ্দারহাটে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন হৃদয় তরুয়া। মিছিলের একপর্যায়ে হৃদয়ের বুকে গুলিবিদ্ধ হয়। এরপর প্রথমে তাকে চট্টগ্রামের পার্কভিউ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরদিন উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। প্রথমে বক্ষব্যাধি হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। টানা পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৩ জুলাই ভোরে হৃদয় তরুয়া মৃত্যুবরণ করেন।
আন্দোলনে তরুয়ার সঙ্গে থাকা তার বন্ধু ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী শামীম হোসেন বলেন, ১৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আবাসিক হল বন্ধ ঘোষণা করলে আমি, হৃদয়, জিমি, শওকত ও তার কয়েকজন বন্ধু দুই নম্বর গেটের একটি বাসায় উঠি। এরপর দিন ১৮ জুলাই আন্দোলনে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল আমাদের। সেদিন হৃদয় তরুয়া আমাদের ফোন করে দ্রুত বের হতে বলে। তখন নতুন ব্রিজ এলাকায় কর্মসূচি চলছিল। কিছুক্ষণ পর খবর আসে, আন্দোলন বহদ্দারহাট দিকে এগোচ্ছে। তখন আমরা দুই নম্বর গেট থেকে হৃদয়, জিমি ও অন্য বন্ধুদের সঙ্গে একত্র হয়ে মিছিলে যোগ দেয়।
তিনি বলেন, মিছিল চলাকালে পুলিশ একপর্যায়ে বারবার টিয়ারশেল ও আক্রমণ চালায়। একই সঙ্গে তিন দিক থেকে হামলার মুখে পড়ে আন্দোলনকারীরা। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় আমরা কিছুটা পিছনে সড়ে আসি এবং হৃদয়কেও আসতে বলি।
কিন্তু সে সড়ে না আসাতে মিছিলের সামনের দিকে পড়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর আমি ও শওকত দুই নম্বর গেটের দিকে যাচ্ছিলাম। সে সময় শওকত বিভাগের একটি গ্রুপে মেসেজ দেখে জানতে পারে, হৃদয় গুলিবিদ্ধ হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে থাকা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত পার্কভিউ হাসপাতালে ছুটে যাই।
হৃদয় সরকারিভাবে একজন স্বীকৃত শহিদ। তার গেজেট নম্বর ১৫০। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় পরিবার ১০ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা পায়। এছাড়া হৃদয়ের বড় বোন মিতু রানীকে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে লাইব্রেরিয়ান পদে চাকরি দেওয়া হয়েছে। তবুও পরিবারের অনিশ্চয়তা কাটেনি।
হৃদয়ের বাবা রতন তরুয়া বলেন, আমি কাঠমিস্ত্রির কাজ করি। এ কাজে আর কয় টাকা আয় হয়? একটা দোকান দিয়েছিলাম, পুঁজির অভাবে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। মেয়ের জামাই কিছু সাহায্য করে বলেই কোনোমতে সংসার চলছে।
এদিকে হৃদয়ের মৃত্যুর ঘটনায় ২০২৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। হৃদয়ের বন্ধু পরিচয় দিয়ে মামলাটি করেন মোহাম্মদ আজিজুল হক। তিনি চট্টগ্রাম নগরের চন্দনাইশ উপজেলার বৈলতলী গ্রামের বাসিন্দা। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২০৬ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং অজ্ঞাত আরও ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে আসামি করা হয়।
মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে রতন বলেন, আমি কোনো মামলা করিনি। তবে চট্টগ্রাম থেকে মামলা করার জন্য আমার ছেলের বন্ধু পরিচয় দিয়ে ফজলুল নামের একজন ফোন দিয়েছিলেন। আমি তাকে বলেছিলাম আমি চট্টগ্রামের কাউকে চিনি না। সে বলেছেন মামলা আপনার করতে হবে না আমরাই করব। আপনি শুধু অনুমতি দেবেন। এরপর তারা মামলা করেছেন। তবে ফজলুল হক আমাকে জানান, তার মামলা পুলিশ নিচ্ছে না। তাই আরেকজনককে দিয়ে মামলা করানো হয়েছে।
তরুয়া হত্যা মামলা সম্পর্কে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চান্দগাঁও থানার উপপরিদর্শক (এসআই) লিটন বলেন, মামলার তদন্তপ্রায় শেষ পর্যায়ে। বর্তমানে কিছু সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কাজ বাকি আছে। এসব কাজ শেষ হওয়ার পরপরই আদালতে মামলার চার্জশিট দাখিল করা হবে।
সময়ের আলো/জোই