৫ থেকে ৮ আগস্ট সরকারবিহীন কেমন ছিল বাংলাদেশ

সময়ের আলো ডেস্ক

জাতীয়

চব্বিশের ৫ আগস্ট। পতন হয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের। কিন্তু মানুষের মনে বিরাজ করছে অনিশ্চয়তা। কে ধরবে দেশের হাল? কার হাতে

2026-08-05T13:22:59+00:00
2026-08-05T13:22:59+00:00
 
  বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬,
২১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
৫ থেকে ৮ আগস্ট সরকারবিহীন কেমন ছিল বাংলাদেশ
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ১:২২ পিএম 
সারা দেশের মানুষ, প্রশাসন, রাষ্ট্র ছিল গভীর অনিশ্চয়তায়। সংগৃহীত ছবি
চব্বিশের ৫ আগস্ট। পতন হয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের। কিন্তু মানুষের মনে বিরাজ করছে অনিশ্চয়তা। কে ধরবে দেশের হাল? কার হাতে ক্ষমতা গেলে বাঁচবে দেশের জনগণ? এমনই প্রশ্ন সকলের। 

তেমনই উৎকণ্ঠার স্মৃতি তুলে ধরেছেন রিকশাচালক আবদুল করিম। সেদিন বিকেলে তিনি তার বাবার জন্য ওষুধ কিনতে বের হয়েছিলেন। বৃদ্ধ বাবা ভর্তি ছিলেন একটি সরকারি হাসপাতালে। আব্দুল করিম পথে নেমে প্রায় আধা ঘণ্টা ভোকাট্টা ঘুড়ির মতো এদিক-ওদিক ঘুরলেন। দেখলেন, প্রায় দোকানের অর্ধেক শাটার নামানো। রাস্তায় পুলিশ নেই, ট্রাফিক সিগন্যাল অচল। মোড়ে মোড়ে জটলা, আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে হেলিকপ্টারের শব্দ। মানুষের হাতে মোবাইল ফোন, সবাই একই খবর শুনছে, ‘হাসিনা দেশ ছেড়েছেন।’

এক মুহূর্তের জন্য তিনি বুঝতে পারছিলেন না, এখন কী হবে। একটা ওষুধের দোকানও খোলা নেই! চারপাশে মানুষের মধ্যে একই সঙ্গে আনন্দ, স্বস্তি, বিস্ময় আর শঙ্কা। কেউ বলছেন, ‘একটা জল্লাদ-যুগের অবসান হলো।’ আবার কেউ বলছেন, ‘এখন যদি বিশৃঙ্খলা শুরু হয়?’ 

বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন অনিশ্চয়তার মুহূর্ত খুব কমই এসেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেওয়া পর্যন্ত টানা তিন দিন কার্যত সরকারবিহীন অবস্থায় ছিল দেশ। সারা দেশের মানুষ, প্রশাসন, রাষ্ট্র ছিল গভীর অনিশ্চয়তায়।  

জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক জনসমাগম হয়। সরকার উৎখাতের জন্য সেদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ ঢাকায় আসে। দুপুরের পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেশত্যাগের ঘোষণার পরপর দেশের মানুষ গণভবনসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় দিকে বিজয় মিছিল নিয়ে যেতে থাকে। সেই দৃশ্য বিবিসি, রয়টার্স, আল জাজিরা, এএফপিসহ দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। 

সরকারপ্রধানের পদত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনের ওপরও প্রভাব পড়ে। পুলিশের থানা, ফাঁড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে। বেশ কিছু থানা ভাঙচুর করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। অস্ত্র লুট ও কয়েদি পালানোর মতো ঘটনাও ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা শঙ্কায় কর্মবিরতির ডাক দেয় পুলিশ। ফলে অনেক এলাকায় চুরি, ডাকাতি , ছিনতাই এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে হামলার মতো ঘটনা ঘটতে শুরু করে। সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ডাকাত আতঙ্কে নির্ঘুম রাত পার করেন বাসিন্দারা। বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিরাপত্তার অভাবে সাময়িক বন্ধ রাখা হয়। 

কেমন ছিল ৬ ও ৭ আগস্ট 

অনেকেই এই সময়কে ‘সরকারহীন বাংলাদেশ’ বলে অভিহিত করলেও বাস্তবে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। রাষ্ট্রপতি তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীসহ রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও কার্যকর ছিল। তবে নির্বাহী সরকারের নেতৃত্ব না থাকায় মন্ত্রিসভার নিয়মিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রশাসনিক নির্দেশনা এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্বে একটি স্পষ্ট শূন্যতা তৈরি হয়। এই কারণেই সাধারণ মানুষের কাছে সময়টিকে সরকারবিহীন সময় হিসেবে মনে হয়েছে।  

আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ-জামান ৬ আগস্ট থেকে প্রশাসনের সবাইকে দফতরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেও পরিস্থিতির কারণে তার প্রতিফলন ঘটেনি। ৬ আগস্ট থেকে ব্যাংক ও বন্দর কার্যক্রম এবং উৎপাদন শুরু হলেও নিরাপত্তার শঙ্কায় কার্যত বন্ধই ছিল অর্থনীতির চাকা। সেদিন সচিবালয়ে কিছু কর্মকর্তা গেলেও কিছুক্ষণের মধ্যে আগুন আতঙ্কের গুজব ছড়িয়ে পড়লে দৌড়ে বেরিয়ে পড়েন। 

৭ আগস্ট ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ শুরু করেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখেছে, সাদা গ্লাভস, বাঁশি আর হাতের ইশারায় শিক্ষার্থীরা যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেন। অনেক এলাকায় তরুণরা রাত জেগে পাড়া পাহারা দেন। মসজিদের মাইক দিয়ে পাহারার ঘোষণা দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা সরকারি ভবন, হাসপাতাল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও পাহারা দেন। কেউ রাস্তা পরিষ্কার করেন, কেউ দেয়ালে গ্রাফিতি এঁকে দেয়ালে দেয়ালে স্লোগান লেখেন, কেউ আবার মানুষকে গুজব ছড়াতে নিষেধ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তখন এক দিকে যেমন গুজব ছড়িয়েছে, অন্যদিকে রক্তদান, উদ্ধার সহায়তা, নিরাপত্তা ও জরুরি তথ্য আদান-প্রদানের জন্যও হাজারো মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত হয়েছিলেন। যেন এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে দেশের মানুষ এক হয়েছিলেন।

এরই মধ্যে নতুন রাজনৈতিক সমাধানের আলোচনা শুরু হয়। রাষ্ট্রপতি, সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়, একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হবে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করার প্রস্তাব দেন, যা পরে গৃহীত হয়।


৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যরা শপথ নেন। এর মধ্য দিয়ে তিন দিনের রাজনৈতিক শূন্যতার আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে। বিবিসি লিখেছে, নতুন সরকারের সামনে তখন ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, প্রশাসন সচল করা, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে সামরিক শাসন, জরুরি অবস্থা ও রাজনৈতিক সংকট এসেছে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ থেকে ৮ আগস্টের এই তিন দিন ছিল ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা। রাষ্ট্রের কাঠামো টিকে থাকলেও রাজনৈতিক নির্বাহী নেতৃত্বের অনুপস্থিতি, আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা এবং একই সঙ্গে নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ— সব মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায়। 

এই তিন দিন প্রমাণ করেছে, একটি সরকারের পতন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, নিরাপত্তা, অর্থনীতি, প্রশাসন এবং সামাজিক সম্পর্ক সবকিছুকে একসঙ্গে নাড়া দেয়। আবার একই সঙ্গে এই সময় দেখিয়েছে, সংকটের মুহূর্তে সাধারণ মানুষও রাষ্ট্রকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। 

আজ দুই বছর পর ফিরে তাকালে বোঝা যায়, আগস্টের সেই তিন দিন শুধু রাজনৈতিক পালাবদলের ইতিহাস নয়, এটি ভয়, আশা, পতন ও পুনর্গঠনের এক বিরল মানবিক কাহিনি হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। 


সময়ের আলো/ইউএমএইচ




  বিষয়:   বাংলাদেশ  গণ-অভ্যুত্থান  আগস্ট 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: