হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান আলোচনায় এমন একটি প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে, যাতে উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হতে পারে। এ বিষয়ে ইরানের একটি জ্যেষ্ঠ সূত্র ও আঞ্চলিক দুই কর্মকর্তা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে এটি হবে তেহরানের জন্য অন্যতম বড় কূটনৈতিক সাফল্য।
তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি সমঝোতা খুবই কাছাকাছি, কিন্তু মার্কিন কর্মকর্তারা বরাবরই বলে আসছেন, প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে তুলে দেওয়ার কোনো প্রস্তাব তারা মেনে নেবেন না।
প্রস্তাবিত সমঝোতা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজের চলাচল ইরান তদারকি করবে। তবে উপসাগর থেকে বেরিয়ে যাওয়া জাহাজের ক্ষেত্রে ইরানের ভূমিকা কী হবে, সেটিই এখন আলোচনার সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত বিষয়।
বর্তমানে ইরান ও ওমান দ্বিপক্ষীয়ভাবে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। দুই দেশই প্রণালির উত্তর ও দক্ষিণ অংশের জলসীমা নিয়ন্ত্রণ করে। ইরান জানিয়েছে, আলোচনায় ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে এবং ভবিষ্যতে প্রবেশ ও প্রস্থান— উভয় দিকের জাহাজই ইরানের জলসীমা ব্যবহার করতে পারে।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএকে বলেছেন, আলোচনায় ‘মৌলিক সমঝোতা’ হয়েছে এবং এটি চূড়ান্ত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। তার ভাষ্য, বাণিজ্যিক জাহাজ যাতে প্রবেশ ও প্রস্থানের সময় ইরানের আঞ্চলিক জলসীমা ব্যবহার করে, সেইভাবেই পরিকল্পনাটি সাজানো হয়েছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইরান হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজ থেকে বহন করা পণ্যের মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ফি আদায় করতে চায়। অন্যদিকে ওমান প্রায় ৩ শতাংশ ফি প্রস্তাব করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো—কোনো ধরনের ফি আরোপ করা যাবে না।
আঞ্চলিক একটি সূত্র জানিয়েছে, হরমুজে ইরানের কিছু ধরনের নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে নীতিগত ছাড় ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে। তবে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বলতে কী বোঝাবে, জাহাজ তল্লাশি কে করবে এবং কোনো ফি আদায় হলে তা বাধ্যতামূলক নাকি স্বেচ্ছাভিত্তিক হবে—এসব বিষয়ে এখনো আলোচনা চলছে।
এদিকে পাঁচটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার ইরানে হামলা চালায়, তাহলে উপসাগরীয় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
একটি উপসাগরীয় সূত্রের ভাষ্য, ইরানের বার্তা ছিল একেবারেই স্পষ্ট— যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অবকাঠামোয় হামলা করলে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে প্রতিশোধমূলক হামলা চালানো হবে।
ইরান ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে তাদের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী কিছু বাণিজ্যিক জাহাজেও হামলার অভিযোগ রয়েছে।
লাস ভেগাসে এক সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, তিনি সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে সমঝোতার পক্ষেই আছেন।
তার ভাষায়, “আমি চুক্তি করতে চাই। আমি মানুষ হত্যা করতে চাই না। তবে একসময় হয়তো সেটা করতে হতে পারে।”
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ইরানে ৩ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে তেহরানের দাবি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের ১৮ জন সামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক সামরিক অভিযানও হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করতে পারেনি।
এদিকে নতুন করে হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করার পর গত দুই দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও কমেছে। কারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানের আশা বেড়েছে।
সময়ের আলো/কেএইচ