হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি উন্মুক্ত করতে অন্তর্বর্তীকালীন একটি সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে ইরান, ওমান ও যুক্তরাষ্ট্র। এই সমঝোতা হলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথে স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরতে পারে। একই সঙ্গে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পরমাণু কর্মসূচিসহ বৃহত্তর ইস্যুতে নতুন করে আলোচনার পথও খুলে যেতে পারে।
কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা, যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা এবং ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত কূটনৈতিক আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা।
মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ‘খুব ভালোভাবে এগোচ্ছে’। তিনি দাবি করেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হবে। একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রণালি খুব দ্রুত খুলে দেওয়া হবে, না হলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে ইরান বরাবরের মতোই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করার কথা অস্বীকার করেছে। তেহরানের দাবি, তারা কেবল ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করছে। দীর্ঘদিন ধরেই ওমান দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ওমানের সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচক পরিবেশে চলছে। তবে নিরাপত্তা, জাহাজ চলাচলের নিয়ম এবং সেবামূল্য নির্ধারণসহ কয়েকটি বিষয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে।
বর্তমান আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয় হলো— হরমুজ প্রণালির নৌপথের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে এবং ইরান বাণিজ্যিক জাহাজের কাছ থেকে কোনো ধরনের ফি নিতে পারবে কি না।
যুদ্ধ শুরুর পর ইরান প্রণালিটি কার্যত বন্ধ করে দিলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। পরে আংশিকভাবে প্রণালি খুললেও জাহাজগুলোকে ইরানের জলসীমা ঘেঁষে উত্তর দিকের পথ ব্যবহার করতে বলা হয়। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ওমানের উপকূল ঘেঁষা দক্ষিণের রুট ব্যবহারের প্রস্তাব দেয়, যা ইরান প্রত্যাখ্যান করে।
বর্তমানে মধ্যস্থতাকারীরা এমন একটি সমঝোতার চেষ্টা করছেন, যাতে দুই দেশের নিরাপত্তা উদ্বেগ বিবেচনায় রেখেই বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা যায়।
তেহরানের দাবি, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা ইরান ও ওমান যৌথভাবে করবে এবং উভয় দেশের সার্বভৌম অধিকার স্বীকৃত হতে হবে। পাশাপাশি নৌ চলাচল নিরাপদ রাখতে নেভিগেশন, পাইলটেজ ও পরিবেশ সুরক্ষার মতো সেবার বিপরীতে ভবিষ্যতে কিছু ফি আরোপের ইঙ্গিতও দিয়েছে ইরান।
তবে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক প্রণালি ব্যবহারের জন্য সরাসরি টোল আদায় করা যায় না।
ওয়াশিংটনের দাবি, কোনো ধরনের ইরানি অনুমতি বা টোল ছাড়াই আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোকে অবাধে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে দিতে হবে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আগের মতোই এমন একটি ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা তাদের লক্ষ্য, যেখানে কোনো পক্ষ নৌপথ নিয়ন্ত্রণ করবে না।
ট্রাম্পও স্পষ্টভাবে বলেছেন, ইরানকে কোনোভাবেই জাহাজ চলাচলের জন্য অর্থ আদায়ের সুযোগ দেওয়া হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আলোচনায় যে প্রস্তাবটি গুরুত্ব পাচ্ছে, তাতে উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজ ইরানের জলসীমা ঘেঁষা উত্তর দিকের পথ ব্যবহার করবে এবং বের হওয়ার সময় ওমানের জলসীমা ঘেঁষা দক্ষিণের রুটে চলবে। এই ব্যবস্থা প্রাথমিকভাবে ৬০ দিনের জন্য কার্যকর হতে পারে এবং ওই সময়ে কোনো ট্রানজিট ফি নেওয়া হবে না।
একই সঙ্গে নৌ-মাইন অপসারণ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণে সেবামূল্য এবং ইরানের বন্দর অবরোধ শিথিল করার বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা বজায় থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি বাজারেও। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় ওয়াশিংটন নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত এড়াতে চাইছে।
এ ছাড়া সামরিক সক্ষমতা ও ব্যয় নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়ছে। ফলে আপাতত নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করাই ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে সমঝোতা হলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংকট তাৎক্ষণিকভাবে শেষ হবে না। কারণ ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, লেবাননে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘাত, ইয়েমেনের হুথিদের হামলা এবং অন্যান্য আঞ্চলিক উত্তেজনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। তবে হরমুজ ইস্যুতে সমঝোতা হলে তা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে এবং ভবিষ্যতে বৃহত্তর কূটনৈতিক সমাধানের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
সময়ের আলো/কেএইচ