ইরানের সঙ্গে পাঁচ মাসের যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে— এমন একাধিক প্রতিবেদনের পর তা নাকচ করেছে হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগন। তবে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের সতর্কতা, বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট ও থাড আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
হোয়াইট হাউস আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি গোলাবারুদ রয়েছে।
ট্রাম্পের ভাষায়, আমাদের প্রয়োজনের চেয়েও অনেক বেশি অস্ত্র রয়েছে। আগের বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেন ও ইউরোপকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বিনা মূল্যে দিয়ে দিলেও আমাদের সক্ষমতায় কোনো ঘাটতি নেই।
তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত অস্ত্র উৎপাদন বাড়াচ্ছে এবং ভবিষ্যতে ইউরোপসহ মিত্র দেশগুলোকে আবারও অস্ত্র সরবরাহ করা হবে।
একই সুরে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে প্রেসিডেন্টের নির্দেশনা অনুযায়ী যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে অভিযান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সব সক্ষমতা রয়েছে।
তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ শুরুর আগে যে পরিমাণ ইন্টারসেপ্টর ছিল, তার প্রায় ৮০ শতাংশ ইতোমধ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের প্রায় অর্ধেকও শেষ হয়ে গেছে। প্রতিবেদনে মজুতের বর্তমান অবস্থাকে ‘বিপজ্জনকভাবে কম’ বলে উল্লেখ করা হয়।
অবশ্য মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ওই তথ্যকে ‘সত্য নয়’ বলে দাবি করেন।
এদিকে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ জানিয়েছে, জুলাইয়ের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি এবং ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় অর্ধেক অবশিষ্ট ছিল। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধপূর্ব মজুতের পর্যায়ে ফিরতে অন্তত তিন বছর সময় লাগতে পারে।
রয়টার্স ও সিবিএস নিউজের পৃথক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের বেশিরভাগই ব্যবহার করে ফেলেছে।
রয়টার্সকে দুটি সূত্র জানিয়েছে, প্রতিটি প্রায় ১০ লাখ ডলার মূল্যের এসব ক্ষেপণাস্ত্রের ‘প্রায় সবই’ ব্যবহৃত হয়েছে।
যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা প্রকাশ্যে এ সংকট স্বীকার করেননি, তবে ২০২৭ অর্থবছরের প্রতিরক্ষা বাজেটে অতিরিক্ত ৯৫ বিলিয়ন ডলার এবং অস্ত্রের মজুত পুনরায় গড়ে তুলতে আরও ২১ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছে প্রশাসন।
বিশ্লেষকদের মতে, আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র কমে গেলে দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতা কমে যায়। ফলে শত্রুপক্ষের আরও কাছাকাছি গিয়ে অভিযান চালাতে হয়, যা সেনাদের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
সিএসআইএস–এর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্নেল মার্ক ক্যানসিয়ানের ভাষায়, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র শেষ হয়ে গেলে বিকল্প হিসেবে যুদ্ধবিমান বা সমুদ্র থেকে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হবে। এতে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
তবে তার মতে, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি।
তিনি বলেন, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ফুরিয়ে গেলে শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর কার্যকর বিকল্প নেই। তখন সেগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব, জর্ডান ও ইসরায়েলসহ বিভিন্ন মিত্র দেশকে প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করে থাকে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নিজেদের মজুত পুনর্গঠন করতে গেলে ভবিষ্যতে এসব মিত্র দেশের কাছে অস্ত্র সরবরাহে বিলম্ব হতে পারে।
এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও অভিযোগ করেছেন, চলতি বছরে ইউক্রেন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর পেয়েছে।
সময়ের আলো/কেএইচ