বিশ্ববাণিজ্যের প্রাণপথে সামরিকতন্ত্রের হোঁচট

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

অতুলনীয় সামরিক শক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এমন ধারণা নিয়ে দশকের পর দশক ধরে পররাষ্ট্রনীতির

2026-09-20T04:21:25+00:00
2026-09-20T04:21:25+00:00
 
  রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৫ আশ্বিন ১৪৩৩
রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
বিশ্ববাণিজ্যের প্রাণপথে সামরিকতন্ত্রের হোঁচট
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:২১ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
অতুলনীয় সামরিক শক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এমন ধারণা নিয়ে দশকের পর দশক ধরে পররাষ্ট্রনীতির ছক কষে গেছে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব। তাদের ধারণা ছিল, সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব, অর্থনৈতিক চাপ এবং নৌবাহিনীর শক্তি ব্যবহার করে আঞ্চলিক প্রতিপক্ষকে নিজেদের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করা যাবে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই ধারণার গুড়ে বালি ঢেলে দিয়েছে।

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে সবসময় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে না। বরং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কখনো কখনো প্রতিপক্ষের কৌশলগত সক্ষমতা ও দরকষাকষির ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

বর্তমান সংকটে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন বলছে, গত তিন দিন আগেও মাত্র চারটি জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করতে পেরেছে। ১০ দিনে অতিক্রম করেছে গড়ে ১৮টি। অথচ এই পথ দিয়ে সংঘাতের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হতো।

অন্যদিকে লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেবও ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে পড়েছে। হুথি বাহিনীর অগ্রযাত্রা এবং উপকূলীয় এলাকার নিয়ন্ত্রণের ফলে বড় তেলবাহী জাহাজগুলো এড়িয়ে চলছে এই পথ। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ সেপ্টেম্বরের পর থেকে কোনো ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি) বাব আল-মান্দেব পার হওয়ার সাহস পায়নি।

সর্বোচ্চ চাপের নীতির উল্টো ফল : ইরানকে চাপে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং সামরিক চাপের সমন্বিত কৌশল অনুসরণ করেছে। এই নীতির মূল লক্ষ্য ছিল তেহরানের অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমিয়ে তার পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতিতে পরিবর্তন আনা। 

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি চাপের আরেকটি ফল হয়েছে। ইরানের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রতিরোধ কাঠামো আরও শক্তিশালী হয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথ এখন কেবল একটি বাণিজ্যিক পথ নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ক্ষেত্র।

এখানে একটি মৌলিক বিষয় স্পষ্ট। তা হলো, সামরিক শক্তি অবকাঠামো ধ্বংস করতে পারে, প্রতিপক্ষের সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং ব্যাপক প্রাণহানি ঘটাতে পারে; কিন্তু টেকসই ও বৈধ রাজনৈতিক কোনো ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে না। এই পার্থক্য উপেক্ষা করলে সামরিক অভিযান এক পর্যায়ে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান না করে বরং নতুন প্রতিরোধ ও সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।

সংকট ছড়িয়ে পড়েছে লোহিত সাগরে : হরমুজকেন্দ্রিক সংঘাতের প্রভাব যখন বাড়তে শুরু করে, তখন এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে ওঠে লোহিত সাগর। ইয়েমেনের হুথি বাহিনী বাব আল-মান্দেবের আশপাশে নিজেদের সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করেছে। পেরিম দ্বীপ, মোখা ও আশপাশের এলাকায় তাদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। 

ফলে লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচলের ওপরও নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। বাব আল-মান্দেব এমন একটি সংকীর্ণ জলপথ, যা লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে। এটি এশিয়া-ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবাণিজ্যপথের অংশ। এর মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ চলাচল করে। বিভিন্ন হিসাবে এই পথ দিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ পর্যন্ত পরিবাহিত হয়।

এই পথ অনিরাপদ হয়ে পড়লে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে কেপ অব গুড হোপ হয়ে যেতে হয়। এতে যাত্রাপথ কয়েক হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ হয়, বাড়ে জ্বালানি, বীমা ও পরিবহন ব্যয় এবং পণ্য পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় লাগে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর ও রফতানিমুখী অর্থনীতির দেশও এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। বাংলাদেশের ইউরোপমুখী জাহাজের ক্ষেত্রে বিকল্প পথে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ এবং ১৫ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।


একই সঙ্গে দুই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে চাপ : হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবের সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দুটি জলপথই একই বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। একটি পথে বাধা তৈরি হলে বাণিজ্য অন্য পথে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়। কিন্তু দ্বিতীয় পথও যদি ঝুঁকির মুখে পড়ে, তখন বিকল্পের সুযোগ দ্রুত কমে যায়। 

এ কারণেই বর্তমান পরিস্থিতি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংঘাত হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এর প্রভাব জ্বালানি বাজার, খাদ্যপণ্য, সার, শিপিং, বীমা, উৎপাদন এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মহাপরিচালক নগোজি ওকোনজো-আইওয়ালা শুক্রবার সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহব্যবস্থার সংকট গত ৮০ বছরের মধ্যে বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে বড় ধরনের বিঘ্নের ঝুঁকি তৈরি করেছে।

তিনি অবশ্য একই সঙ্গে বলেছেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা এখনও যথেষ্ট স্থিতিস্থাপক। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থাও জানিয়েছে, হরমুজ সংকটের কারণে জ্বালানি, পরিবহন, বীমা ও অর্থায়নের ব্যয় বাড়লে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়তে পারে ছোট ও মাঝারি ব্যবসার ওপর। এসব প্রতিষ্ঠান বিশ্বে প্রায় ৭০ শতাংশ কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত।

পশ্চিমা নৌজোটের জন্য কঠিন সমীকরণ : বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই লোহিত সাগরে নৌবাহিনী মোতায়েন রেখেছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, উন্নত প্রযুক্তি ও ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে প্রতিটি হুমকির মোকাবিলা করা দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

এখানে সংঘাতের একটি বড় অসমতা রয়েছে। একদিকে রয়েছে কোটি ডলারের সমমূল্যের আধুনিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা; অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত কম ব্যয়ে তৈরি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র। ফলে প্রতিটি হামলা প্রতিহত করতে যে ব্যয় হচ্ছে, তা আক্রমণ পরিচালনার ব্যয়ের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে। 

এই পরিস্থিতি সামরিক শক্তির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। একটি দেশ তার সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে পারলেও যদি সেই শক্তি ব্যবহার করে সমুদ্রপথকে স্থায়ীভাবে নিরাপদ রাখা সম্ভব না হয়, তা হলে সেই শ্রেষ্ঠত্বের কৌশলগত মূল্য কতটা সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

সামনে কঠিন দুই পথ : এ অবস্থায় ওয়াশিংটনের সামনে মূলত দুটি কৌশলগত পথ রয়েছে। প্রথমটি হলো সংঘাত আরও বাড়িয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে প্রবেশ করা। কিন্তু তাতে অর্থনৈতিক ক্ষতি, জ্বালানি সংকট, সামরিক ব্যয় এবং সংঘাত বিস্তারের ঝুঁকি বাড়বে। 

অন্য পথ হলো আঞ্চলিক শক্তির পরিবর্তিত বাস্তবতা মেনে নিয়ে সামরিক আধিপত্যের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমঝোতা ও শক্তির ভারসাম্যের দিকে যাওয়া। এর অর্থ কোনো পক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ নয়; বরং বাস্তবতা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর নিরাপত্তা কেবল বাইরের সামরিক শক্তি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত করা কঠিন।


বর্তমান পরিস্থিতি তাই একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমেছে, আর বাব আল-মান্দেবেও বড় জাহাজগুলো ঝুঁকি এড়িয়ে চলছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রপথ এখন শুধু সামরিক সংঘাতের ক্ষেত্র নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও শক্তির ভারসাম্যের পরীক্ষাক্ষেত্র। বহু বছর ধরে সামরিক শক্তির মাধ্যমে আঞ্চলিক বাস্তবতা নিয়ন্ত্রণের যে কৌশল অনুসরণ করা হয়েছে, বর্তমান সংকট সেই কৌশলের সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

শেষ পর্যন্ত হরমুজ থেকে বাব আল-মান্দেব পর্যন্ত পরিস্থিতি যে শিক্ষা দিচ্ছে, তা হলো সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে একটি অঞ্চলকে প্রভাবিত করা সম্ভব হলেও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপদ বাণিজ্যপথ নিশ্চিত করতে সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনীতি, আঞ্চলিক সমঝোতা এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা স্বার্থকে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে
  বিষয়:   বিশ্ববাণিজ্য  সামরিকতন্ত্র  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: