মেধা পাচার : রাষ্ট্রের বুদ্ধিবৃত্তিক রক্তক্ষরণ

মতামত

একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার প্রাকৃতিক সম্পদ, সুউচ্চ অট্টালিকা কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেই শক্তির সবচেয়ে মূল্যবান

2026-08-07T05:18:19+00:00
2026-08-07T05:18:19+00:00
 
  শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬,
২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬
মতামত
মেধা পাচার : রাষ্ট্রের বুদ্ধিবৃত্তিক রক্তক্ষরণ
প্রকাশ: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৫:১৮ এএম 
হবিবুর হমান । ছবি : সংগৃহীত
একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার প্রাকৃতিক সম্পদ, সুউচ্চ অট্টালিকা কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেই শক্তির সবচেয়ে মূল্যবান ভিত্তি হলো তার মানুষ- বিশেষ করে জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতায় সমৃদ্ধ মানবসম্পদ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে জাতি তার মেধাবীদের সম্মান দিতে পেরেছে, গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিবেশ গড়ে তুলেছে এবং যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করেছে, সেই জাতিই টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়েছে।

বিপরীতে যে সমাজে মেধা অবমূল্যায়িত হয়েছে, সেখানে উন্নয়নের গতি যত দ্রুতই হোক না কেন, তার ভিত দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই সত্য আরও নির্মমভাবে ধরা দিচ্ছে। কারণ আমরা এমন একসময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় তরুণ, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ক্রমশ বিদেশমুখী হয়ে উঠছেন। এই প্রবণতাকে আমরা সাধারণ অভিবাসন বলে পাশ কাটিয়ে যেতে পারি না; এটি মূলত একটি রাষ্ট্রের বুদ্ধিবৃত্তিক রক্তক্ষরণ- যার অভিঘাত অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গবেষণা, শিল্প ও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে দীর্ঘমেয়াদে অনুভূত হবে।

ইউনেস্কোর গ্লোবাল ফ্লো অব টেরিটরি-লেভেল স্টুডেন্টসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫২ হাজার ৭৯৯ জন শিক্ষার্থী বিশ্বের অন্তত ৫৫টি দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য গেছেন। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪৯ হাজার ১৫১ এবং ২০২১ সালে ছিল ৪৪ হাজার ৩৩৮ জন। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। আরও পেছনে তাকালে দেখা যায়, ২০১৩ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ২৪ হাজার। অর্থাৎ এক দশকে বিদেশগামী শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়েও বেশি।

মেধা পাচারের অর্থনৈতিক দিকটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীর পেছনে সরকারের গড় ব্যয় ৫ লাখ টাকার বেশি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একজন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এই ব্যয় কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা এবং সরকারি মেডিকেল কলেজের একজন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে তা ১৫ লাখ টাকারও বেশি। এই অর্থ আসে জনগণের করের টাকা থেকে। অর্থাৎ রাষ্ট্র একজন দক্ষ প্রকৌশলী, চিকিৎসক বা গবেষক তৈরি করতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। কিন্তু তিনি যদি স্থায়ীভাবে বিদেশে থেকে যান, তা হলে সেই বিনিয়োগের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল বাংলাদেশের পরিবর্তে অন্য দেশ ভোগ করে। উন্নত দেশগুলো কার্যত বিনা খরচে প্রস্তুত মানবসম্পদ পেয়ে যাচ্ছে, আর বাংলাদেশ হারাচ্ছে তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

শিক্ষক পর্যায়েও একই বাস্তবতা বিদ্যমান। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য গিয়ে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষক আর ফিরে আসেননি। কেউ বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন, কেউ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে স্থায়ীভাবে কর্মরত হয়েছেন। এটি শুধু শিক্ষক সংকট সৃষ্টি করছে না, বরং নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরাও অভিজ্ঞ গবেষক ও দক্ষ শিক্ষকের কাছ থেকে শেখার সুযোগ হারাচ্ছে। ফলে ক্ষতির পরিধি বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি তাই অর্থনৈতিক নয়, মানবসম্পদ ভিত্তিক। কারণ উন্নয়নের পরবর্তী ধাপ নির্ধারিত হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জৈবপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সেমিকন্ডাক্টর, চিকিৎসা গবেষণা এবং উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতার ওপর। সেই প্রতিযোগিতায় সফল হতে হলে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, মেধাবীদের ধরে রাখার রাষ্ট্রনীতি প্রয়োজন। আর যদি সেই মেধাই একের পর এক দেশ ছেড়ে চলে যায়, তা হলে উন্নয়নের দৃশ্যমান অগ্রগতির আড়ালে একটি নীরব শূন্যতা ক্রমশ বিস্তৃত হবে যার মূল্য কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে পুরোপুরি হিসাব করা সম্ভব নয়।

মেধা পাচারের সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো মেধার যথাযথ মূল্যায়নের সংকট। একজন শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন, আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন কিংবা বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন, তখন তার প্রত্যাশা থাকে দেশে ফিরে তিনি যোগ্যতা অনুযায়ী একটি কর্মপরিবেশ পাবেন। কিন্তু বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিগত পরিচয়, রাজনৈতিক প্রভাব, তদবির কিংবা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। তখন একজন মেধাবীর কাছে বিদেশ কেবল একটি বিকল্প নয়, বরং আত্মসম্মান রক্ষার শেষ আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়।

একই ধরনের বাস্তবতা দেখা যায় গবেষণা খাতেও। বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসা কিংবা তথ্যপ্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে বিশ্বমানের গবেষণা করতে হলে আধুনিক গবেষণাগার, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশে গবেষণা এখনও অনেকাংশে ব্যক্তি উদ্যোগনির্ভর। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা বাজেট সীমিত, গবেষণা অনুদান অপর্যাপ্ত এবং গবেষণার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া জটিল। ফলে একজন তরুণ গবেষক যখন দেখেন, বিদেশে একই গবেষণার জন্য উন্নত ল্যাব, পর্যাপ্ত অনুদান এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সহজলভ্য, তখন তার বিদেশমুখী হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

মেধা পাচারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এবং দক্ষতার সঙ্গে কাজের অসামঞ্জস্য। গত এক দশকে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নতুন বিভাগ চালু হয়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে শিল্পায়ন, গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর কর্মক্ষেত্র গড়ে ওঠেনি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া বহু শিক্ষার্থী তাদের বিশেষায়িত বিষয়ে কাজের সুযোগ পান না। শেষ পর্যন্ত তারা হয় পেশা পরিবর্তন করেন, নয়তো বিদেশে চলে যান।

বাংলাদেশের উন্নয়নের সাম্প্রতিক সাফল্যের গল্পে আমরা প্রায়ই অবকাঠামো, রফতানি, রেমিট্যান্স কিংবা ডিজিটাল অগ্রগতির কথা বলি। কিন্তু চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে একটি দেশের প্রতিযোগিতা নির্ধারিত হবে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার সক্ষমতার ওপর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, বায়োটেকনোলজি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, নবায়নযোগ্য জ্বালানি কিংবা উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তির মতো খাতে নেতৃত্ব দেবে সেই দেশ, যারা তাদের মেধাবীদের ধরে রাখতে পারবে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য মেধা পাচার কেবল একটি শিক্ষা সংকট নয়, এটি একটি জাতীয় নিরাপত্তা ও উন্নয়ন সংকট।


এখানে একটি প্রচলিত যুক্তি প্রায়ই সামনে আসে- বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা তো রেমিট্যান্স পাঠান, তা হলে ক্ষতি কোথায়? বাস্তবতা হলো, শ্রম অভিবাসন ও মেধা অভিবাসন এক বিষয় নয়। একজন দক্ষ গবেষক বা বিজ্ঞানী বিদেশে যে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী মূল্য সৃষ্টি করেন, তার অর্থনৈতিক মূল্য বহু ক্ষেত্রে তার পাঠানো সম্ভাব্য রেমিট্যান্সের চেয়েও অনেক বেশি। তা ছাড়া বিদেশে স্থায়ী হয়ে যাওয়া উচ্চশিক্ষিতদের বড় একটি অংশ নিয়মিত রেমিট্যান্সও পাঠান না। ফলে অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি দেশ হারায় জ্ঞান, নেতৃত্ব ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা।

একসময় চীন থেকেও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সরকার গবেষণা অনুদান, আধুনিক ল্যাবরেটরি, কর সুবিধা, স্টার্টআপ তহবিল এবং উচ্চ বেতনের মাধ্যমে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়। ভারতও আইটি, মহাকাশ গবেষণা, বায়োটেক ও স্টার্টআপ খাতে একই ধরনের নীতি অনুসরণ করেছে। আজ ভারতীয় প্রযুক্তি খাত কিংবা চীনের গবেষণা সাফল্যের পেছনে বিদেশফেরত মেধাবীদের বড় অবদান রয়েছে।

বাংলাদেশও চাইলে এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে। প্রথমত মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। নিয়োগ, পদোন্নতি এবং গবেষণা অনুদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতাকে একমাত্র মানদণ্ডে পরিণত করতে হবে। একজন তরুণ যদি বিশ্বাস করেন যে তার যোগ্যতা যথাযথভাবে মূল্যায়িত হবে, তা হলে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা অনেকাংশে কমবে।
একই সঙ্গে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। 

বিদেশে পড়তে যাওয়া কিংবা গবেষণা করা কোনো অপরাধ নয়, বরং বিশ্বমানের শিক্ষা গ্রহণ একটি জাতির জন্য সম্পদ। কিন্তু সেই সম্পদকে দেশে ফিরিয়ে আনার মতো পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একজন মেধাবী তরুণ যেন বুক ফুলিয়ে বলতে পারেন, ‘আমার স্বপ্ন পূরণ করতে বিদেশে যেতে পারি, কিন্তু দেশের জন্য কাজ করার সর্বোত্তম সুযোগও আমার নিজের দেশেই রয়েছে।’ এই বিশ্বাস তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

রাষ্ট্রের উচিত এখনই মেধা পাচারকে একটি জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা। কারণ এটি শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় বা কর্মসংস্থানের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, শিল্পায়ন এবং জাতীয় প্রতিযোগিতা সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। আজ যে তরুণ গবেষকটি দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, তিনি হয়তো আগামী দিনের নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী, বিশ্বমানের প্রযুক্তি উদ্যোক্তা বা যুগান্তকারী চিকিৎসা উদ্ভাবনের পথিকৃৎ হতে পারতেন। তার সেই সম্ভাবনার সুফল যদি অন্য দেশ ভোগ করে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশই।

গণমাধ্যমকর্মী
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   মেধা  পাচার  রাষ্ট্র  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: