পেটের ডান দিকে হঠাৎ তীব্র ব্যথা— সাধারণত মানুষ একে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা ভেবে ভুল করেন। কিন্তু অ্যান্টাসিড বা গ্যাসের ওষুধ খেয়েও যখন ব্যথা কমে না, তখন পরীক্ষার পর অনেক সময় ধরা পড়ে পিত্তথলিতে পাথর বা গলস্টোন। বর্তমান সময়ে এটি পরিপাকতন্ত্রের অন্যতম একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি শনাক্ত করে সঠিক চিকিৎসা নিলে পিত্তথলির পাথর সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব। তবে অবহেলা করলে এটি মারাত্মক জটিলতার রূপ নিতে পারে।
পিত্তরস ও পিত্তথলির কাজ
যকৃত বা কলিজার নিচে পিত্তথলি অবস্থিত, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৭ থেকে ১০ সেন্টিমিটার। এর মূল কাজ হলো যকৃত থেকে উৎপাদিত পিত্তরস সাময়িকভাবে সংরক্ষণ করে রাখা, যা পরবর্তীতে খাদ্য হজমে সাহায্য করে।
পিত্তথলিতে পাথর যেভাবে তৈরি হয়
পিত্তথলিতে প্রধানত তিনটি উপাদান থাকে— কোলেস্টেরল, পিত্ত লবণ এবং বিলিরুবিন। যখন এই উপাদানগুলোর প্রাকৃতিক ভারসাম্যে বিঘ্ন ঘটে, তখন ছোট ছোট স্ফটিকের জন্ম হয়। সময়ের ব্যবধানে এই স্ফটিকগুলোই বড় হয়ে পাথরের রূপ নেয়।
পাথর তৈরির প্রধান কারণগুলো হলো :
পিত্তরসে কোলেস্টেরলের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি।পিত্তথলি সম্পূর্ণরূপে খালি হতে না পারা।অতিরিক্ত বিলিরুবিন উৎপাদন।পিত্তথলিতে সংক্রমণ বা প্রদাহ হওয়া।
পাথরের প্রকারভেদ
গঠন ও উপাদানের ওপর ভিত্তি করে পিত্তথলির পাথর প্রধানত তিন প্রকারের হয়ে থাকে :
কোলেস্টেরল পাথর : এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় (প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে)।
পিগমেন্ট পাথর : বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলে এই পাথর হয়, যা সাধারণত যকৃত বা রক্তজনিত রোগের কারণে হয়ে থাকে।
মিশ্র পাথর : এটি কোলেস্টেরল, ক্যালসিয়াম এবং বিলিরুবিনের সমন্বয়ে গঠিত হয়।
কাদের ঝুঁকি বেশি?
চিকিৎসাবিজ্ঞানে পিত্তথলিতে পাথরের ঝুঁকির বিষয়টি বোঝাতে ‘৫এফ’ সূত্র ব্যবহার করা হয় :
ফিমেল : নারীদের এই সমস্যা বেশি হয়।
ফর্টি : ৪০ বছরের বেশি বয়সীদের ঝুঁকি বেশি।
ফ্যাট : অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা।
ফার্টাইল : গর্ভধারণক্ষম নারী।
ফেয়ার : পশ্চিমা দেশের ফর্সা ত্বকের মানুষ (কিছু ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)।
অন্যান্য ঝুঁকির কারণ : ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, গর্ভাবস্থা, ইস্ট্রোজেন হরমোনের ওষুধ সেবন, বংশগত ইতিহাস, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা বা দ্রুত ওজন কমানো, এবং ফাস্টফুড ও উচ্চ চর্বিযুক্ত খাদ্যাভ্যাস। চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানের তরুণ প্রজন্মেও এই সমস্যা বাড়ছে, যার প্রধান কারণ স্থূলতা ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।
পিত্তথলির পাথরের লক্ষণ
বেশির অন্য মানুষের ক্ষেত্রে অন্য কোনো কারণে আল্ট্রাসাউন্ড করার সময় আকস্মিকভাবে পাথর ধরা পড়ে। তবে লক্ষণ প্রকাশ পেলে তা নানা রূপ নিতে পারে :
পেটের ডান পাশে তীব্র ব্যথা, যা কাঁধ বা পিঠে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর ব্যথা বেড়ে যাওয়া।
বমি ভাব, বদহজম, বুকজ্বালা ও পেট ফাঁপা।
বিপজ্জনক বা জরুরি লক্ষণ : জ্বর, কাঁপুনি, জন্ডিস, চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া, প্রস্রাবের রং গাঢ় হওয়া, ফ্যাকাশে মল এবং পেটে তীব্র অসহ্য ব্যথা। এমন লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে হাসপাতালে যাওয়া উচিত।
রোগ নির্ণয় বা শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া
আল্ট্রাসাউন্ড টেস্ট : এটি সবচেয়ে সহজ, সাশ্রয়ী ও অত্যন্ত নির্ভুল পরীক্ষা।রক্ত পরীক্ষা : সিবিসি, লিভার ফাংশন টেস্ট, সিরাম বিলিরুবিন এবং লিভার এনজাইম পরীক্ষা।সিটি স্ক্যান ও এমআরসিপি : পিত্তনালীতে পাথর সন্দেহ হলে এই পরীক্ষাগুলো করা হয়।ইআরসিপি : এটি দিয়ে পাথর শনাক্ত করার পাশাপাশি কখনো কখনো অপসারণও করা হয়।
চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার পদ্ধতি
পিত্তথলিতে পাথর থাকা সত্ত্বেও যাদের কোনো উপসর্গ বা কষ্ট থাকে না, তাদের সাধারণত অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসকের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকলেই চলে। তবে বারবার ব্যথা ও উপসর্গ দেখা দিলে অস্ত্রোপচারই শ্রেয়।
ল্যাপারোস্কোপিক কোলেসিস্টেকটমি : এটি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে পিত্তথলি অপসারণের আদর্শ চিকিৎসা পদ্ধতি। এতে ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে পিত্তথলি কেটে বাদ দেওয়া হয়। এর সুবিধা হলো—কম ব্যথা, স্বল্প রক্তপাত, দ্রুত আরোগ্য লাভ এবং এক থেকে দুই দিনের মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছুটি পাওয়া যায়।
ওষুধ কি পাথর গলাতে পারে?
নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ছোট কোলেস্টেরল পাথরের জন্য ওষুধ ব্যবহৃত হলেও তা সবার জন্য কার্যকর নয়। চিকিৎসায় মাস বা বছরও লাগতে পারে এবং ওষুধ বন্ধ করলে পুনরায় পাথর হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই অস্ত্রোপচারকেই স্থায়ী সমাধান ধরা হয়।
চিকিৎসায় বিলম্ব হলে যেসব জটিলতা হতে পারে :
পিত্তথলির তীব্র প্রদাহ বা ফোঁড়া সৃষ্টি হওয়া।পিত্তথলি ছিদ্র হয়ে যাওয়া বা টিস্যু ধ্বংস হওয়া।পিত্তনালীতে বাধা ও সংক্রমণজনিত জন্ডিস।অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ (প্যানক্র্যাটাইটিস) ও অন্ত্রে প্রতিবন্ধকতা।পিত্তথলিতে ক্যানসারের একটি বিরল ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
পিত্তথলি অপসারণ কি বিপজ্জনক?
অনেকের মনে ভয় থাকে যে পিত্তথলি কেটে বাদ দিলে হজমশক্তি নষ্ট হয়ে যাবে। চিকিৎসকদের মতে, পিত্তথলি না থাকলেও যকৃত নিয়মিত পিত্তরস তৈরি করতে থাকে এবং তা সরাসরি ক্ষুদ্রান্ত্রে চলে যায়। ফলে মানুষ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
পিত্তপাথর প্রতিরোধের উপায়
শতভাগ প্রতিরোধ সম্ভব না হলেও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে ঝুঁকি কমানো সম্ভব :
স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন এবং মাসে ২-৪ কেজির বেশি দ্রুত ওজন কমানোর ক্রাশ ডায়েট এড়িয়ে চলুন।নিয়মিত অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট ব্যায়াম করুন।ডায়েটে ফলের শাকসবজি, দানা শস্য এবং ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার বাড়ান।ফাস্টফুড, ভাজা পোড়া, অতিরিক্ত চিনি ও ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবার বর্জন করুন।প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
দ্রষ্টব্য : এই নিবন্ধটি সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য তৈরি। স্বাস্থ্যগত যেকোনো সমস্যায় নিজে নিজে চিকিৎসা না করে অবশ্যই রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সময়ের আলো/জেডি