ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় পুলিশ ও প্রশাসন তাদের ক্ষমতা ব্যবহার করে মসজিদের মাইক খুলে ফেলছে। এমন ঘটনা সামনে আসতেই রাজ্য সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন রাজ্যটির বিরোধীদলীয় নেতারা।
বিরোধী রাজনৈতিক দলের অভিযোগ শীর্ষ আদালতের রায়ের অপব্যাখ্যা করে রাজ্য প্রশাসন একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে টার্গেট করছে। মুসলিম নেতারা বলছেন আদালতের নির্দেশ ছিল ডেসিবেল বা শব্দের মাত্রা বেঁধে দেয়ার, মাইক পুরোপুরি বন্ধ করার নয়।
অন্যদিকে নবগঠিত বিজেপি সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, এটি কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে নিশানা করে করা হচ্ছে না। রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের বিদ্যমান শব্দবিধি প্রতিটি ধর্মীয় স্থানে সমানভাবে প্রয়োগ করার জন্যই এই সর্বাত্মক অভিযান চালানো হচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত সোমবার। মালদা জেলার চাচল থানার অন্তর্গত একটি মসজিদের মাইক খোলার ভিডিও স্থানীয় জনগণের মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায় চাচোল থানার পুলিশ আধিকারিকরা দাঁড়িয়ে থেকে ওই মসজিদের মাইক স্থানীয় যুবকদের মাধ্যমে খুলে দিচ্ছেন।
এ ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় মোথাবাড়ির বিধায়ক নজরুল ইসলাম। তিনি জানান একাধিক মসজিদ কমিটির তরফে পুলিশের বিরুদ্ধে মসজিদের মাইক খুলেতে চাপ সৃষ্টি করার অভিযোগ আসছে।
তিনি বলেন, আমি জনগণের উদ্দেশ্যে আবেদন জানাবো পুলিশ যদি মাইক খুলতে আসে তাহলে প্রথমেই তাদের কাছে সরকারের এই সংক্রান্ত অর্ডার কপি চাইবেন। যদি দিতে না পারে তাহলে আপনারা নিজেরা কেউ মাইক খুলবেন না। যদি পুলিশ নিজেই সেই মাইক খুলে ফেলেতে চায় সেক্ষেত্রে আপনারা বাধা দেবেন না। গোটা প্রক্রিয়ার ভিডিও করবেন। এবং যিনি গিয়েছেন সেই অফিসারের নাম এবং পদবী আপনারা লিখে রাখবেন।
তৃণমূল কংগ্রেসের এই নেতা আরো বলেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা মেনে পুলিশ যদি নির্দিষ্ট শব্দসীমার মধ্যে মাইক বাজানোর আবেদন জানায় আমরা সেই আবেদনে একশ শতাংশ সহমত পোষণ করছি। কিন্তু কোন রকম নির্দেশিকা ছাড়া মাইক খুলে নেওয়ার বিষয়টি আমরা মেনে নেব না।
তার দাবি, আমরা বুঝতে পারছি আমাদের একটা সম্প্রদায়কে টার্গেট করা হচ্ছে। কয়েকদিন আগে একজন মহিলা (তসলিমা) কলকাতায় এসে দাবি করেছেন মাদ্রাসা মসজিদে জঙ্গি তৈরি করা হয়। আমরা এমন বক্তব্যের পরেও চুপ থেকেছি। মালদার আদিনা মসজিদকে আদিনাথ মন্দির দাবি করা হয়েছে। তারপরও আমরা চুপ থেকেছি। এক শ্রেণির মানুষ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার রাজ্য বিধানসভায় সাংবাদিক সম্মেলন করে আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী বলেন রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় পুলিশ মসজিদের মাইক খুলে নেওয়া হচ্ছে, এজন্য আমরা রাজ্য পুলিশকে চিঠি দিয়েছি। এই কাজের কারণ সহ ব্যাখ্যার দাবি জানিয়েই এই চিঠি।
নওশাদ সিদ্দিকি উল্লেখ করেছেন, রাজ্যের একাধিক জেলা থেকে তার কাছে অভিযোগ এসেছে যে, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় কর্মসূচিতে মাইক ব্যবহারের জন্য পুলিশ নোটিস জারি করছে। অনেক ক্ষেত্রে সেই নোটিসে মাইক ব্যবহার না করার নির্দেশও দেয়া হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেছেন। বিষয়টির প্রেক্ষিতে তিনি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশও উল্লেখ করেন। তার বক্তব্য, আইন অনুযায়ী যেখানে শর্ত মেনে মাইক ব্যবহার করা যায়, সেখানে পুলিশ কেন সম্পূর্ণভাবে মাইক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করছে, সেই প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হওয়া দরকার।
বিধায়কের দাবি, এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি হলে রাজনৈতিক প্রচার, জনসভা, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং ধর্মীয় কর্মসূচি- সব ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হতে পারে। তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণভাবে জনসাধারণের কাছে বক্তব্য পৌঁছে দেয়ার অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই প্রেক্ষিতে মাইক ব্যবহারের বিষয়টি আইনসম্মতভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত বলে তিনি মত প্রকাশ করেছেন।
তার অভিযোগ, লিখিত কোনো নির্দেশিকা ছাড়াই শুধুমাত্র মৌখিক আদেশে বিভিন্ন জেলায় মসজিদের মাইক খুলতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা সংবিধানের ১৪, ১৯, ২১ এবং ২৫-২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। তিনি পুলিশি অভিযানের সুনির্দিষ্ট এসওপি প্রকাশের পাশাপাশি নিয়মবহির্ভূত পদক্ষেপ গ্রহণকারী পুলিশ আধিকারিকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন। তার মতে, কোনো স্পষ্ট নিয়ম বা সরকারি নোটিশ ছাড়া পুলিশের এই ধরনের আচরণ সাধারণ মানুষের মনে অযথা ভয়, উৎকণ্ঠা ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছে।
রাজনৈতিক নেতার পরিচয়ের পাশাপাশি নওশাদ ফুরফুরা শরীফের একজন ধর্মীয় নেতা হিসাবে পশ্চিমবঙ্গে যথেষ্ট প্রভাবশালী। সংখ্যালঘু মুসলিমদের উদ্দেশ্যে তার বার্তা, এই ইস্যুতে কেউ যেন কোনও রকম প্ররোচনা অথবা চক্রান্তে কেউ পা এগিয়ে দেবেন না। তার তিনি বলেন আমরা কলকাতা হাইকোর্টের ব্যবস্থা হব। পুলিশের এমন অতি সক্রিয়তার বিরুদ্ধে আমাদের আইনি লড়াই চলবে।
অন্যদিকে বৃহস্পতিবার কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী বলেন, মন্দিরে, মসজিদে মাইক এটা আমরা দেখে আসছি। কোন মন্দিরে মসজিদে মাইক অনেকের অসুবিধার কারণ হতেই পারে আমার নিজেরও হয়। কিন্তু অসুবিধার কারণ শুধুমাত্র মসজিদের মাইকে সীমাবদ্ধ নয়। মন্দিরের ক্ষেত্রেও শব্দদূষণ হয়। আমি নিজে যে এলাকায় থাকি তার পাশে মন্দিরের মাইকে ছাত্রছাত্রীদের অসুবিধা হয়। রাতভর কীর্তন চলে আমার ঘুমের অসুবিধা হয়। আমি মাঝেমধ্যে অনুরোধ করি তাদের কিছুটা সাউন্ড কমিয়ে রাখার জন্য। আমার নিজের মন্দির আছে আমি সেখানে সন্ধ্যের পর সাউন্ড বন্ধ করে রাখি। যাতে কারোর সমস্যা না হয়। তাই শুধু মসজিদ নয় যে আওয়াজে মানুষের সমস্যা হয় সেই আওয়াজ নিয়ন্ত্রণ করা উচিত বলে আমি মনে করি।
তিনি বলেন , আমি দিল্লিতে একটা বড় সময় থাকি। দিল্লির জামা মসজিদ প্রত্যেক মসজিদ কে শব্দ নিয়ন্ত্রনে রাখার জন্য নির্দেশ জারি করে। পশ্চিমবঙ্গেও কোন কোন মসজিদের আওয়াজের অনেকের অসুবিধা হতে পারে। আমি অস্বীকার করছি না। তবে এমনটা যেন না হয় কোন নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষকে টার্গেট করে মাইক খুলতে বাধ্য করা হচ্ছে । আমার মনে হয় স্থানীয় ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বললে এই সমস্যার সমাধান বেরিয়ে আসবে। না হলে মুসলমানদের নির্দিষ্ট আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে এমন বাতাবরণ রাজ্যে তৈরি হবে।
১৯৯৬ সালে কলকাতা হাই কোর্ট এবং পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন রায়ে জানিয়েছে, যে উপাসনালয়ে মাইক ব্যবহার মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত নয়। শব্দদূষণ রোধ করতে নির্দিষ্ট ডেসিবেল মাত্রা মেনে চলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট ও হাই কোর্টের শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত নির্দেশিকা এবং পরিবেশ আইনের বিধি মেনে, শব্দের ডেসিবেল সীমা লঙ্ঘন করলে প্রশাসন মাইক ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে।
সাধারণত রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত বা সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত লাউডস্পিকার বা মাইক ব্যবহারের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা বা বিধিনিষেধ থাকে।
প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই রাজ্য সরকার নির্দেশ দিয়েছিল যাতে দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের নিয়মাবলি কড়াকড়ি ভাবে মেনে চলা হয়। সেই নির্দেশিকা২১ অনুযায়ী, আবাসিক এলাকাগুলিতে দিনের বেলা ৫৫ ডেসিবেল এবং রাতে ৪৫ ডেসিবেলের মধ্যে শব্দের মাত্রা সীমাবদ্ধ রাখার নিয়ম রয়েছে। বিভিন্ন জেলায় পুলিশ প্রশাসন মসজিদ কমিটিগুলির সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে উচ্চ ক্ষমতার মাইক পরিবর্তন করে কম ক্ষমতার সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহারের অনুরোধ জানিয়েছে। নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এবং শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, আইন সবার জন্য সমান এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্বিশেষে এই নির্দেশিকা অমান্য করলে কোনো ছাড় দেয়া হবে না।
মুসলিম নেতারা বলছেন ১৯৯৬-এর ১ এপ্রিল কলকাতা হাই কোর্ট মাইক নামাতে নির্দেশ দেয়নি, বরং ডেসিবেল বেঁধে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টেরও একই নির্দেশ ছিল। আমরা আইনি পদক্ষেপ করব।
আইনজীবী তথা সিপিএম নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, আজানের মাইক বাজতে পারে। তবে দূষণ নিয়ন্ত্রক পর্ষদের সীমার মধ্যে রাখতে হবে আওয়াজকে। অতএব আপনারা প্রত্যেকেই ভারতের নাগরিক হিসেবে আইন মেনে চলবেন। এর বাইরে পুলিশ মাইক সরাতে পারে না।
এদিকে মসজিদের মাইক বিতর্কে সরকারি দলের অবস্থান স্পষ্ট করতে গিয়ে বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, যে যার ধর্ম তার বাড়ির মধ্যে পালন করলেই ভালো হয়। মসজিদে যান নামাজ পড়ুন। মন্দিরে যান মন্ত্র পরুন। মাইক লাগানোর প্রয়োজন কি? বাড়িতে ধর্ম করুন। কোনও আপত্তি নেই।
বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশন শেষে মসজিদে মাইক খোলা ইস্যুতে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে সরাসরি অভিযোগ জানিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল ছেড়ে এনসিপিআই নামক দলে যোগ দেয়া তিন সংখ্যালঘু সাংসদ। ইন্ডিয়া জোটের অখ্যাত এই জোটসঙ্গীর তিন সংখ্যালঘু সাংসদ শায়ের সঙ্গে দেখা করে মাইক খুলে দেয়ার ভিডিও দেখানোর ঘটনা বিস্তারিত জানিয়ে লিখিত অভিযোগ শাহের হাতে তুলে দিয়েছেন।
বিজেপি সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ আবার বলেছেন, কে করছে জানি না। সব জায়গায় মাইক লাগানোর অনুমতি নেই। ধর্মাচরণ যখন শুরু হয়েছিল তখন কি পৃথিবীতে মাইক ছিল? তাহলে মাইকের ব্যবহার কেন? অন্যের যাতে অসুবিধা না হয় সেজন্য সাউন্ড কন্ট্রোলে থাকা উচিত। এক্ষেত্রে জোর করে কিছু করানোর দরকার নেই।
সময়ের আলো/জেডআই