বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে যুগান্তকারী পরিবর্তনের দ্বার খুলতে যাচ্ছে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর। নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে থাকা এ বন্দর ২০২৯ সালে চালু হলে প্রায় ৮ হাজার ২০০ টিইইউ ধারণক্ষমতার কনটেইনার জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারবে। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি রফতানি বাণিজ্যের সময় ও পরিবহন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই বন্দর পরিদর্শন করার কথা রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দীর্ঘদিনের দাবি ছিল গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ। এটি চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমবে। মাদার ভেসেলগুলো দেশের বন্দরেই কনটেইনার খালাস করতে পারবে। বিদেশে পণ্য রফতানি করতে ট্রানজিট বা ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরের প্রয়োজনও ফুরিয়ে যাবে।
ভিড়তে পারবে বেশি ড্রাফট এবং মাদার ভেসেল : চট্টগ্রাম বন্দরে ১০ মিটারের বেশি ড্রাফটের বেশি কার্গো কিংবা কনটেইনার জাহাজ ভিড়তে পারে না। সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফটের জাহাজই কেবল জেটিতে ভিড়তে পারে। ফলে রফতানি পণ্যবাহী বড় জাহাজগুলো চট্টগ্রাম বন্দরেই ভিড়তে পারে না। এসব জাহাজের ড্রাফট ১৪ থেকে ১৮ মিটার।
তাই চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ছোট কনটেইনার জাহাজে করে তৈরি পোশাকভর্তি জাহাজ যায় ট্রানজিট পোর্টে। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর বন্দর, মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাং এবং কলম্বো বন্দরে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কনটেইনার জাহাজ যায়। যা ফিডার ভেসেল নামে পরিচিত। উদ্দেশ্য ছোট কনটেইনার জাহাজ থেকে বড় পরিসরের মাদার ভেসেলে পণ্য তুলে দেওয়া।
এভাবে ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে দেশের তৈরি পোশাক রফতানি হয়ে আসছে। ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে এসব বন্দর থেকে মাদার ভেসেলে করে তৈরি পোশাক যায় বিভিন্ন গন্তব্যে। শুধু চট্টগ্রাম বন্দরের পরিসর কম, কম ড্রাফট এবং অপারেশনাল সুবিধা স্বল্পতায় ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা নিতে হয় দেশের ব্যবসায়ীদের।
এতে একদিকে সময়ের অপচয় হয়। অন্যদিকে বায়ারদের কাছে রফতানি পণ্য পৌঁছতে দেরি হয়ে যায়। রফতানি খাতে ফ্রেইট বা ভাড়াও বেশি গুনতে হয় দেশের ব্যবসায়ীদের। তাই ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছেন।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের জন্য নানা সুবিধা মিলবে। প্রায় ৮ হাজার ২০০ (প্রতিটি ২০ ফুট দৈর্ঘ্যরে) ধারণক্ষমতার কনটেইনারবাহী বড় জাহাজ সরাসরি এই বন্দরে ভিড়তে পারবে। বড় জাহাজ সরাসরি ভিড়লে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে সময় ও খরচ অনেক কমে যাবে। এটি চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের ওপর অতিরিক্ত কনটেইনার ও জাহাজের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে।
গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ২০২৯ সালের মধ্যে চালু হবে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর। এই বন্দরটি চালু হলে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো প্রায় ৮ হাজার ২০০ কনটেইনার ধারণক্ষমতার জাহাজ এবং প্রায় ১ লাখ টন ধারণক্ষমতার মালবাহী জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারবে।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলোতে গভীরতার সীমাবদ্ধতা থাকায় বড় ‘মাদার ভেসেল’ সরাসরি ভিড়তে পারে না। এটি রফতানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ড্রাফট বা গভীরতার সীমাবদ্ধতায় অধিকাংশ আমদানি-রফতানি পণ্য সিঙ্গাপুর, কলম্বো ও মালয়েশিয়ার মতো আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরে খালাস করে ফিডার ভেসেলে দেশে আনতে হয়।
এতে প্রতি চালানে অতিরিক্ত খরচ ও সময় বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরে প্রায় ১৬ মিটার গভীরতার নৌ-চ্যানেল এবং আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে। এটি চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে আসা জাহাজের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি ধারণক্ষমতার জাহাজ সরাসরি বার্থিং নিতে পারবে।
ফলে বিদেশি ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরের ওপর নির্ভরতা কমবে। পণ্য পরিবহন ও খালাস কার্যক্রম আরও দ্রুত, সাশ্রয়ী ও দক্ষ হবে। মাতারবাড়ী বন্দর শুধু দেশের বাণিজ্যের সক্ষমতাই বাড়াবে না। ভবিষ্যতে এটি আঞ্চলিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘হাব’ হিসেবে গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ট্রানজিট কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে ১২ থেকে ১৪ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
জানা গেছে, বিশ্বের অনেক দেশেই গভীর সমুদ্রবন্দর আছে। এশিয়া মহাদেশেও আছে গভীর সমুদ্রবন্দর। কিন্তু পরিকল্পনার অভাবে বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি গভীর সমুদ্রবন্দর। ভিয়েতনামে গভীর সমুদ্রবন্দর আছে। সেখানে ব্যবসায়ীরা দ্রুত পণ্য সরবরাহ করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সেই সুযোগ এখনও তৈরি হয়নি। শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াও আছে গভীর সমুদ্রবন্দর। এসব গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে বার্ষিক উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর : চট্টগ্রাম বন্দরের প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা হয় ১৮৮৭ সালে। এই বন্দর চ্যানেলের ড্রাফট বা গভীরতা সাড়ে ৯ মিটারের মতো। এ কারণে সেখানে বড় জাহাজ ভিড়তে পারে না। দেশে যে বাড়তি গভীরতায় জাহাজ ভেড়ানোর টার্মিনাল দরকার তা উপলব্ধিতে এসেছিল ১৯৭৮ সালে। ওই বছর শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রথম উদ্যোগ নেন। নেদারল্যান্ডস ইকোনমিক ইনস্টিটিউট নামের একটি সংস্থা ১১টি স্থান পরিদর্শন করে কর্ণফুলী নদীর মোহনার কাছে গভীর পানির টার্মিনাল নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সুপারিশ করেছিল। যদিও তার স্বল্প সময়ে সেই উদ্যোগ আর বাস্তবায়িত করতে পারেননি।
পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকারের আমলে গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রসঙ্গটি আলোচনায় আসে। ২০০৯ সালে জাপানের প্যাসিফিক কনসালট্যান্ট ইন্টারন্যাশনাল ৯টি সম্ভাব্য এলাকা পরিদর্শন করে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সুপারিশ করে সমীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেয়। ২০১২ সালে তৎকালীন সরকার সোনাদিয়া দ্বীপে গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রকল্প অনুমোদন দেয়। ২০১৬ সালে প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হওয়ার সময় ধরা হয়। অর্থায়ন করার আলোচনা চলছিল চীনের সঙ্গে।
২০১৪ সালের জুনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের সময় সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে নির্ধারিত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়নি। সোনাদিয়ায় অনিশ্চয়তার মধ্যেই পটুয়াখালীর পায়রায় সরকার গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ঘোষণা দেয়। তবে তখনও সমীক্ষা হয়নি। পরে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এইচআর ওয়েলিংফোর্ডকে দিয়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করানো হয়। এরপর ১ হাজার ৮৩৪ কোটি ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৪ টাকা) খরচ ধরে প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়ন করা হয়। এতে এটি দাঁড়ায় বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বন্দর প্রকল্প।
২০১৮ সালে পায়রায় প্রথম টার্মিনাল নির্মাণের ঘোষণা দেন সে সময়ের নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। তবে বিশেষজ্ঞরা নির্মাণ এবং নদীর পলি অপসারণে বিপুল ব্যয়ের কারণে এ প্রকল্প নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। তৎকালীন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীও বলেছিলেন, পায়রায় গভীর সমুদ্রবন্দর হচ্ছে না।
এদিকে জাপান নিয়ে আসে ‘বিগ বি’ ধারণা। যা হলো ‘দ্য বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’। এ কৌশলগত পরিকল্পনায় এই অঞ্চলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, বন্দর, যোগাযোগ, শিল্পাঞ্চলসহ সমন্বিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা বলা হয়।
২০১৪ সালে বাংলাদেশ ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী যৌথভাবে ‘বিগ বি’ উদ্যোগের ঘোষণা দেন। এর বাস্তব রূপ দিতে দেশটির উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) ২০১৬ সালে একটি জরিপ করে মাতারবাড়ীতে বন্দর নির্মাণের পরামর্শ দেয়। এরপর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ‘মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প’ নেয়। যা যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগ।
ব্যবসায়ীরা দারুণ খুশি : চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক এবং তৈরি পোশাক রফতানিকারক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, গভীর সমুদ্রবন্দর ব্যবসায়ীদের প্রাণের দাবি। এই বন্দর এখন বাস্তবতার পথে হলেও অনেক আগেই করার দরকার ছিল। এতে ব্যবসায়ীদের ব্যয় কম হতো। আমদানি-রফতানির পরিসর অনেক বেড়ে যেত। দেরিতে হলেও দেশে গভীর সমুদ্রবন্দরের স্বপ্ন এখন বাস্তবতার পথে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমই নেতারা জানান, পোশাক খাতে প্রতি মিনিটের হিসাব হয়। রফতানি বাজারে যে যত দ্রুত পণ্য সরবরাহ করতে পারে, যে যত কম খরচে পাঠাতে পারে সে দেশই এগিয়ে থাকে, ক্রয়াদেশ বেশি পায়। ট্রান্সশিপমেন্ট করতে গিয়ে দেশের ব্যবসায়ীরা অন্য দেশের বন্দরের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
এমনকি ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্টে জট লেগে গেলে বাংলাদেশের রফতানি পণ্য ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পৌঁছানো যেত না। এতে ক্রয়াদেশ বাতিল হওয়ার মতো ঝুঁকি তৈরি হতো সবসময়। নিজেদের গভীর সমুদ্রবন্দরে বড় জাহাজ ভিড়লে ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্টের যন্ত্রণা থেকে ব্যবসায়ীরা মুক্তি পাবে। দেশের বাণিজ্যের গতিও দ্রুত হবে।
সময়ের আলো/এসএকে