‘শুধু আমরা বিলুপ্ত হচ্ছি না, আমাদের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিও।’ গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে বিশ্ব আদিবাসী দিবসের অনুষ্ঠানে এমনই শঙ্কার কথা বারবার উঠে এলো সাঁওতালসহ বিভিন্ন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর বক্তাদের কণ্ঠে।
রোববার (৯ আগস্ট) উপজেলার শাখাহার ইউনিয়নের দইহারা শিহিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে র্যালি, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়, যেখানে উৎসবের রঙের পাশাপাশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে অস্তিত্ব সংকটের এই উদ্বেগ।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর তুলনায় বহু পিছিয়ে থাকা সমতলের আদিবাসীরা আজ বিলুপ্তির পথে। এই বিলুপ্তি শুধু জনসংখ্যাগত নয়- প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে থাকা মাতৃভাষা, লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য একইসঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে নীরবে।
আদিবাসী দিবসের অনুষ্ঠান। ছবি : সময়ের আলো
বক্তারা মন্তব্য করেন, দেশের দরিদ্রতম এই জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ মানুষ আজও ভূমিহীন ও উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ক্রমাগত উচ্ছেদের শিকার হচ্ছেন, যা তাদের সাংস্কৃতিক শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে ক্রমশ।
স্বাধীনতার ৫ দশক পরও সাঁওতালসহ সমতলের আদিবাসীরা তাদের ন্যায্য অধিকার ও মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত বলে অভিযোগ করেন বক্তারা। তারা দাবি জানান, আদিবাসীদের সাংবিধানিকভাবে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে, সমতলের আদিবাসীদের জন্য গঠন করতে হবে পৃথক মন্ত্রণালয় ও একটি স্বতন্ত্র ভূমি কমিশন।
আলোচনা সভায় পল্লবী মুর্মুর সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন ‘অবলম্বনের’ নির্বাহী পরিচালক প্রবীর চক্রবর্তী, শাখাহার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির, শিরিগাও স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবু হাই সিদ্দিক, আদিবাসী নেত্রী সরলা পালসা, গ্লোরিয়া তিগ্যা, আদিবাসী নেতা সুশীল টপ্য, তারামনি টপ্য, আবিনা টপ্য, ফিলিমনা হেমব্রম প্রমুখ।
শঙ্কার এই সুরের বিপরীতে অনুষ্ঠানজুড়েই দেখা গেছে নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা। সকালে ব্যানার-ফেস্টুন হাতে বর্ণাঢ্য র্যালি নিয়ে এলাকা প্রদক্ষিণ করেন সাঁওতালসহ বিভিন্ন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নারী-পুরুষরা। অনুষ্ঠানস্থলে বসানো ৫ টি স্টলে বিভিন্ন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী তুলে ধরে তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, বাদ্যযন্ত্র, কৃষি সরঞ্জাম ও গৃহস্থালি সামগ্রী। দিনভর চলে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির চিরচেনা গান ও নাচের পরিবেশনা- যেন হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কার মধ্যেই নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার এক নীরব প্রতিরোধ।
এবারের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল- জীবন রক্ষা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতে আদিবাসী ধাত্রীদের অবদানকে সম্মান জানানো, যা মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসুরক্ষা এবং প্রথাগত জ্ঞান সংরক্ষণের গুরুত্বকে সামনে আনে। ‘অবলম্বন’ ও ‘আমরাই পারি’ সংগঠনের যৌথ আয়োজনে এই কর্মসূচিতে আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছে সুইজারল্যান্ড দূতাবাস, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।