গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার একটি গ্রামে অসুস্থ গরু জবাই করে মাংস বণ্টনের পর এ পর্যন্ত প্রায় ৩৭ জন নারী, পুরুষ ও শিশু অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। এই ৩৭ জনের মধ্যে নারী ১৯ জন, শিশু ৪ জন এবং পুরুষ ১৪ জন। এ ছাড়া চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে উপজেলার কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের আরও ৬ জন অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানান, তারা চিকিৎসা নিয়ে ভালো হয়ে গেছেন।
গবেষক ও চিকিৎসকদের মতে, মানুষের শরীরে সাধারণত তিন ধরনের অ্যানথ্রাক্স দেখা যায়। প্রথমত, ত্বকে ফোসকা পড়ে। বাকি দুই ধরনের অ্যানথ্রাক্স পরিপাকতন্ত্র ও শ্বাসনালিতে হয়। ত্বকে ফোসকা পড়া অ্যানথ্রাক্স সাধারণত কম ঝুঁকিপূর্ণ হলেও পরিপাকতন্ত্র ও শ্বাসনালির অ্যানথ্রাক্স মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. কামরুল হাসান বলেন, ‘তাদের সবার শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ পাওয়া গেছে এবং সবাইকে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে।’
ডা. কামরুল হাসান জানান, অ্যানথ্রাক্স মারাত্মক সংক্রামক রোগ। আক্রান্ত গবাদি পশুর মাধ্যমে প্রধানত মানুষের শরীরে এ রোগ সংক্রমিত হয়। মানুষ থেকে মানুষে অ্যানথ্রাক্স ছড়ানোর ঘটনা কম। তবে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত ও পুঁজ থেকে সুস্থ মানুষের শরীরে ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে।
সুন্দরগঞ্জে যেভাবে ছড়াল অ্যানথ্রাক্স
চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে উপজেলার কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের দুলাল গ্রামে অসুস্থ গরু জবাই করে মাংস খাওয়ার পর ৬ জন অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাদের শরীরে জ্বর ও হাত-পায়ে ফোসকা দেখা দেয়।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস ও উপজেলা হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত ১১ সেপ্টেম্বর উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের বাছহাটি গ্রামের মঞ্জুরুল ইসলামের একটি গাভী অসুস্থ হয়ে পড়লে সেটি জবাই করে মাংস ভাগ-বাটোয়ারা করে গ্রামের প্রায় ১০০ পরিবারের লোকজন। এর পর ১৮ সেপ্টেম্বর প্রথমে ৭ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা যায়।
পরে উপজেলার আরও চারটি ইউনিয়নে উপসর্গ ছড়িয়ে পড়ে। ইউনিয়নগুলো হলো তারাপুর, কঞ্চিবাড়ি, সোনারায় ও রামজীবন।
অ্যানথ্রাক্সের লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসা নেওয়া বাছহাটি গ্রামের রুমি বেগম (২৯) বলেন, ‘অসুস্থ গরুর মাংস ১০০ ভাগে ভাগ করে প্রতি ভাগ মাংস আমরা ১ হাজার টাকা দিয়ে কিনেছি। মাংস ধুয়ে বাড়িতে রান্না করে খেয়েছি। দুয়েক দিন পর আমার বাম হাতে ফোসকা পড়ে। ফোসকা বড় হলে তীব্র জ্বরে ভুগি। এরপর গ্রামে আরও অনেক মানুষের একই অবস্থা হয়। তারপর হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিই। আমার হাতের ফোসকা এখনও ভালো হয়নি।’
বাছহাটি গ্রামের শফিক আলম (৪৫) বলেন, ‘আমি মাংস খাইনি। মঞ্জুরুল ইসলামের অসুস্থ গরুটি জবাই করেছিলাম শুধু। আমার দুই হাতে রক্ত লেগেছিল। এর কয়েক দিন পর দুই হাতে দুটি ফোসকা ওঠে। গত ৮ দিন ধরে চিকিৎসা নিচ্ছি। এখন আমি ভালো আছি।’
অসুস্থ গরুর মাংসে অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস বাছহাটি গ্রামের অসুস্থ গরুর মাংসের দুটি নমুনা সংগ্রহ করে গত ২১ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় রোগ অনুসন্ধান গবেষণাগারে (সিডিআইএল) পাঠায়। গত ২৩ সেপ্টেম্বর পাওয়া প্রতিবেদনে দুটি নমুনাতেই অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু পাওয়া গেছে বলে নিশ্চিত করেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কে এম ইফতেখারুল ইসলাম।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. কামরুল হাসান বলেন, ‘রোগীদের মধ্যে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ রয়েছে এবং আক্রান্ত গরুর মাংসেও অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু পাওয়া গেছে। ফলে ধরে নেওয়া যায় তারা অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত।’
তিনি আরও বলেন, ‘এর আগে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে কঞ্চিবাড়ি গ্রামে ৬ জনের মধ্যে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দিলে তাদের নমুনা পরীক্ষা করে ৪ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু পাওয়া যায়।’
শুধু গরুকে ভ্যাকসিন, অন্য গবাদি পশু এখনও বাইরে
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কে. এম ইফতেখারুল ইসলাম জানান, উপজেলায় গবাদি পশু রয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার। এর মধ্যে গত ৩১ আগস্ট কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের পশ্চিম দুলাল গ্রামের এক খামারির একটি গরু অসুস্থ হয়ে পড়লে সেটি জবাই করা হয়। এ ঘটনায় ৬ জনের মধ্যে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা যায়। গত বছর সুন্দরগঞ্জের একটি গ্রামে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ হয়েছিল। সেই কারণে এ বছর জুলাই থেকে ১৫টি ইউনিয়নে রিং ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রমের আওতায় এ পর্যন্ত ১৯ হাজার গরুকে অ্যানথ্রাক্সের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী আক্রান্ত এলাকার তিন কিলোমিটারের মধ্যে ১০০ ভাগ গবাদি পশুকে ভ্যাকসিন দেওয়ার কার্যক্রম চালু রয়েছে। আমাদের কাছে বর্তমানে ১১ হাজার ভ্যাকসিন মজুদ আছে। এ ছাড়া ১৫ হাজার ভ্যাকসিন বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। ভ্যাকসিন কার্যক্রমে আমাদের ১৫ জন লোক কাজ করছেন। আশা করি দ্রুত আক্রান্ত এলাকায় ভ্যাকসিন কার্যক্রম শেষ করা যাবে।’
এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় কীভাবে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু ছড়াচ্ছে জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানান, সাধারণত এই জীবাণু মাটিতে মিশে থাকে। তা ছাড়া ঘাসের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এনএন