দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপোড়েন, পারস্পরিক অভিযোগ ও আস্থার সংকটের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন করে সংলাপের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর প্রথম সাক্ষাতে একদিকে যেমন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির আলোচনা হয়েছে, অন্যদিকে ঢাকার পক্ষ থেকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং শহিদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজনদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি জানানো হয়েছে। ফলে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগের পাশাপাশি দিল্লির জন্য প্রত্যর্পণ ইস্যু দুটি বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রায় আধা ঘণ্টার সৌজন্য সাক্ষাতে ভারতীয় হাইকমিশনার দুই দেশের সম্পর্ক ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। সাক্ষাতের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানান, দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় ‘এনাবলিং এনভায়রনমেন্ট’ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য ভারতকে অনুরোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহিদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজনদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। হাদি হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারত যেসব কাগজপত্র চেয়েছিল, বাংলাদেশ তা সরবরাহ করেছে।
পুনরাবৃত্তি হবে না :
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও বৈঠকের আগে-পরে আলোচনা হয়েছে। এ ঘটনায় ভারত দুঃখ প্রকাশ করেছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি দুঃখ প্রকাশের নয়; বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধার প্রশ্ন।
তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্রের নির্বাহী, আইন প্রণয়ন ও বিচার বিভাগ- তিনটি স্তম্ভ রয়েছে। বাংলাদেশের আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার বিষয়টি বিচার বিভাগের সঙ্গে সম্পর্কিত। তার বক্তব্য থাকলে তা আদালতেই উপস্থাপনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ৫ আগস্ট তিনি বাংলাদেশের বিচার বিভাগের প্রতি বিদ্বেষ ছড়িয়েছেন এবং ভারত সরকার তাকে সে সুযোগ দিয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রের কোনো স্তম্ভকে খাটো করার মতো কোনো কর্মকাণ্ড আর হবে না- এটাই প্রত্যাশা। তিনি বলেন, ‘তাদের সঙ্গে আমার যা কথা হয়েছে, আমি কিছুটা হলেও আশ্বস্ত, এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না।’ সীমান্ত হত্যা ও পুশইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়গুলো সংক্ষেপে আলোচনায় এসেছে। তবে এসব নিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে আগের দিনই তার আলোচনা হয়েছে।
দিল্লির আমন্ত্রণ, সিদ্ধান্ত হয়নি : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকার গঠনের দিনই প্রধানমন্ত্রীকে একটি চিঠি দিয়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তবে ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে সোমবারের সাক্ষাতে সফর নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি আরও স্পষ্ট করেন, প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকসের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়নি; বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
ফ্রেশ স্টার্ট চায় ঢাকা :
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর সোমবার দুপুরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠক শেষে তিনি বলেন, গণতন্ত্রে ইস্যু থাকবে এবং আলোচনার মাধ্যমে সেসব ইস্যুর সমাধানও সম্ভব। দুই দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটি ভালো সম্পর্ক। তিনি বলেন, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী একসঙ্গে বসলে অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। অব্যাহত সংলাপ, সহযোগিতা ও জনগণের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমে দুই দেশ তাদের অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ভৌগোলিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা দিক থেকে বাংলাদেশ ও ভারত পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। তাই অতীতকে পেছনে ফেলে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে সুদৃঢ় করতে একটি নতুন সূচনা বা ‘ফ্রেশ স্টার্ট’ জরুরি।
প্রত্যর্পণে আইনি পরীক্ষার কথা দিল্লির :
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ঢাকার প্রত্যাশা- দিল্লি অতীতের ভুলগুলো অনুধাবন করে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। ঢাকা আলোচনার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সমস্যার সমাধানে আগ্রহী হলেও পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা ও স্বার্থের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং হাদি হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজনদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আহ্বানের বিষয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার জানিয়েছেন, বিষয়গুলো আইনগতভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দিল্লি সিদ্ধান্ত নেবে। ফলে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার রাজনৈতিক বার্তা এলেও বাস্তবে এর অগ্রগতি অনেকটাই নির্ভর করছে প্রত্যর্পণ, সীমান্ত পরিস্থিতি, পুশইনসহ অমীমাংসিত ইস্যুগুলো কীভাবে সমাধান করা হয় তার ওপর।
সংলাপের দরজা খোলা রাখার তাগিদ :
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হাইকমিশনারের প্রথম সাক্ষাৎ মূলত সৌজন্য সাক্ষাৎ হলেও এর পরবর্তী আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, দুই দেশ ধারাবাহিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বৈরী পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে।
তার মতে, আলোচনার দরজা খোলা রাখলে যেকোনো বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং টানাপোড়েন নিরসন সম্ভব। দ্রুত অন্যান্য বিষয়েও কার্যকর আলোচনা শুরু হবে এবং পরস্পরের বিষোদ্গারের পরিবর্তে সুস্থ কূটনীতির ধারা ফিরে আসবে- এমন প্রত্যাশা তার।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের প্রথম সাক্ষাৎ তাই নিছক সৌজন্য সাক্ষাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। প্রত্যর্পণ ইস্যুতে ঢাকার দাবি, দিল্লির আইনি পর্যালোচনার আশ্বাস এবং ফ্রেশ স্টার্টের রাজনৈতিক বার্তা- সব মিলিয়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নতুন কোনো অধ্যায়ে প্রবেশ করছে কি না এখন সেটিই দেখার বিষয়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি