ব্যস্ত নগরজীবনে দীর্ঘ ছুটির সুযোগ সবসময় মেলে না। অফিস, পড়াশোনা, সংসার কিংবা নানা দায়িত্বের ফাঁকে অনেকেরই মন চায় একটু খোলা আকাশ, সবুজ প্রকৃতি আর শহরের কোলাহল থেকে সামান্য দূরে যেতে। তবে তার জন্য কয়েক দিনের ছুটি বা বড় বাজেটের প্রয়োজন নেই। ঢাকার আশপাশেই রয়েছে বেশ কিছু জায়গা, যেখানে সকালে বেরিয়ে সারা দিন ঘুরে সন্ধ্যার মধ্যে বাড়ি ফেরা সম্ভব। পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে এমন এক দিনের ভ্রমণ হয়ে উঠতে পারে একঘেয়েমি কাটানোর দারুণ এক উপায়- লিখেছেন নিবেদিতা দাস
উদয়পুর ডেসটিনেশন
উদয়পুর ডেসটিনেশন মূলত একটি প্রকৃতিনির্ভর ট্যুরিস্ট স্পট এবং ডে-আউট সেন্টার। এটি ঢাকার বাড্ডা এলাকার ১০০ ফিট মাদানি অ্যাভিনিউতে অবস্থিত। একসময় ‘ঠিকানা ডে আউটারস’ নামে পরিচিত ছিল। এখানে গ্রামীণ পরিবেশের প্রাধান্য ছিল, এখন সেখানে যুক্ত হয়েছে রাজস্থানের বিখ্যাত স্থাপত্যশৈলী এবং আধুনিক রুচির ছোঁয়া। সবুজে ঘেরা বিশাল প্রাঙ্গণ, শান্ত জলাশয় আর সাদা প্রাসাদের এই রাজকীয় রূপান্তর জায়গাটিকে বর্তমান সময়ের অন্যতম আলোচিত ট্রাভেল স্পটে পরিণত করেছে। পরিবার নিয়ে সময় কাটানো, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের জন্য এটি বর্তমানে ঢাকার অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য।
এখানকার প্রধান আকর্ষণ হলো উদয়পুর সিটি প্যালেসের অনুপ্রেরণায় তৈরি প্রাসাদটি। প্রাসাদের এক পাশেই রয়েছে মুন্সীগঞ্জের (বিক্রমপুর) বনেদি বাড়ির আদলে নির্মিত একটি তিন তলা স্থাপনা। শীত ও বসন্তের সময়ে পুরো এলাকাটি গাঁদা, ডালিয়া, পিটুনিয়া আর কসমসসহ রঙিন ফুলে ছেয়ে থাকে। শিশুদের দৌড়াদৌড়ি করার জন্য রয়েছে বিশাল সবুজ মাঠ। মাঠের পাশে বসে শান্ত জলাশয় দেখার জন্য দোলনা ও বসার সুন্দর ব্যবস্থা আছে।
এখানে একটি কফি শপ আছে যার সিলিংটি কৃত্রিম ফুলে ঢাকা। কফি শপের বাইরে চেকার্ড ফ্লোর এবং ফ্লোরাল বাইসাইকেল ফটোপ্রেমীদের জন্য চমৎকার একটি স্পট।
বেলাই বিল
গাজীপুর জেলার চেলাই নদীর পাশঘেঁষে অবস্থিত বেলাই বিল একটি মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক স্থান। বাড়িয়া, ব্রাহ্মণগাঁও, বক্তারপুর এবং বামচিনি মৌজা গ্রাম ঘেরা এই বিল প্রায় ৮ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। বছরের বেশিরভাগ সময় এখানে পানি
থাকলেও বর্ষাকালে এর প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। বর্ষাকালে বিলের ব্যস্ততা বেড়ে যায় জেলেদের কারণে, আর শুষ্ক মৌসুমে এটি বোরো ধানের ক্ষেত হয়ে ওঠে।
বিলের সৌন্দর্য যেন ছবির মতো জীবন্ত- শাপলা আর শালুকে ভরা জলরাশি, ভেসে বেড়ানো নৌকা, আর মাঝে ভাসমান গ্রাম। বামচিনি মৌজার দ্বীপগ্রামটি বিশেষভাবে পরিচিত, কারণ পুরো গ্রামে মাত্র একটি বাড়ি রয়েছে। এ ছাড়া, সময় থাকলে কাছাকাছি ভাওয়াল পরগণার শ্মশানঘাট পরিদর্শন করতে পারেন।
আড়িয়াল বিল
মুন্সীগঞ্জ, ঢাকা এবং শ্রীনগরের এক অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নাম আড়িয়াল বিল। প্রায় ১৩৬ বর্গকিলোমিটার জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই বিলের বেশিরভাগ অংশ মুন্সীগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত।
আড়িয়াল বিলের সৌন্দর্য ঋতুভেদে নানা রূপ ধারণ করে। বর্ষাকালে বিলে শাপলা, কচুরিপানার ফুল এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এই জায়গাকে অনন্য করে তোলে। আর শীতকালে ফসলি জমিতে চাষ করা হয় নানাবিধ শীতকালীন সবজি। আড়িয়াল বিলে ভ্রমণের পথে শ্যামসিদ্ধ মঠ দেখে আসতে পারেন। এ ছাড়া জগদীশ চন্দ্র স্মৃতি জাদুঘর, ভাগ্যকুল জমিদার বাড়ি এবং মাওয়া ফেরিঘাটের মতো আকর্ষণীয় স্থান রয়েছে। ঋতু অনুযায়ী এর পরিবর্তনশীল রূপ আপনাকে মুগ্ধ করবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
মৈনট ঘাট
দোহার উপজেলার মৈনট ঘাটকে ডাকা হয় মিনি কক্সবাজার নামে। ঢাকার নবাবগঞ্জ থেকে সোজা একটি রাস্তা এসে মিলেছে দোহারের মৈনট ঘাটে। পদ্মার এক পাড়ে দোহার আর অপর পাড়ে ফরিদপুর। ঘাটের পূর্ব পাশে বিশাল চর মানুষকে সাগরের বেলাভূমির কথা মনে করিয়ে দেয় আর সামনের বিস্তীর্ণ পদ্মা হয়ে যায় সাগর। আর চাইলে এখান থেকে নৌকায় করে পদ্মা নদীতে ঘুরে বেড়ানো যায় কিংবা পাড় ধরে হাঁটা যায় ইচ্ছামতো।
ঢাকার কাছে হওয়ার এবং দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসা যায় বিধায় মৈনট ঘাট ভ্রমণ সবার কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। স্পিড বোটে পদ্মার ওপর ঘুরে বেড়াতে পারেন। মোটামুটি সাইজের একটা ট্রলার প্রতি ঘণ্টার জন্য ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নিতে পারে। এ ছাড়া চাইলে লক্ষ্মীপ্রসাদ স্থানে নেমে পোদ্দারবাড়ি দেখে নিতে পারেন। এ ছাড়া জজবাড়ি, উকিলবাড়ি, কোকিলপ্যারি দালান, আন্ধার কোঠা ইত্যাদি দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতে পারেন।
বালিয়াটি জমিদার বাড়ি, মানিকগঞ্জ
পুরোনো স্থাপত্য দেখতে ভালোবাসেন যারা, তাদের জন্য মানিকগঞ্জের বালিয়াটি জমিদার বাড়ি হতে পারে চমৎকার একটি ডে-ট্রিপ। প্রাচীন স্থাপত্য, বিশাল অট্টালিকা ও ইতিহাসের নানা স্মৃতি এখানে ভ্রমণকে আকর্ষণীয় করে তোলে। সকালে ঢাকা থেকে বের হয়ে দুপুরের আগে সেখানে পৌঁছানো যায়। স্থাপনা ঘুরে দেখার পাশাপাশি ছবি তোলা ও আশপাশের পরিবেশ উপভোগ করা যায়।
ভ্রমণ হোক পরিকল্পনা করে
ডে-লং ট্যুর মানেই হুট করে বেরিয়ে পড়া নয়। বরং সময় ও বাজেটের সঙ্গে মিলিয়ে গন্তব্য নির্বাচন করাই ভালো। কোথায় কত সময় লাগবে, যানজটের সম্ভাবনা কেমন, খাবারের ব্যবস্থা আছে কি না, প্রবেশমূল্য কত এবং কখন ফিরতে হবে, এসব আগে থেকে জেনে নিলে ভ্রমণ অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক হয়।
নদী, জলাশয় বা বনভূমিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে বের হওয়া জরুরি। সঙ্গে ছাতা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, পানি, অতিরিক্ত পোশাক ও মোবাইলের চার্জের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। শিশু ও বয়স্কদের সঙ্গে থাকলে তাদের প্রয়োজনের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।
সময়ের আলো/আআ
কাছাকাছি কোথাও বেড়াতে যাওয়ার জন্য বিশেষ কোনো উপলক্ষের প্রয়োজন নেই। জীবনের ব্যস্ততার মাঝে এক দিন সময় বের করে কাছের মানুষদের নিয়ে একটু সবুজের কাছে যাওয়া, নদীর পাড়ে বসা কিংবা ইতিহাসের পুরোনো পাতায় ঘুরে আসাই কখনো কখনো মনকে অনেকটা সতেজ করে দিতে পারে। দূরের গন্তব্যের অপেক্ষায় না থেকে তাই ছুটির এক দিনকে বানিয়ে ফেলুন ছোট্ট এক ভ্রমণ-উৎসব।