বেশি ভলিউমে ইয়ারবাড ব্যবহার করলে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ছবি : প্রতীকী
এখন অনেক মানুষই দৈনন্দিন জীবনে ইয়ারবাড ব্যবহার করে থাকেন। যাতায়াতের সময় গান শোনা, ব্যায়াম করা, ফোনে কথা বলা কিংবা কাজের ফাঁকে কিছু শোনা- এমন বিভিন্ন প্রয়োজনে অনেকেই দীর্ঘ সময় ইয়ারবাড ব্যবহার করেন। কিন্তু প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কানে ইয়ারবাড লাগিয়ে রাখলে, তা কি ধীরে ধীরে কান বা শ্রবণশক্তির ক্ষতি করতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে ঘন ঘন এবং বেশি ভলিউমে ইয়ারবাড ব্যবহার করলে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ শব্দ শুনলে ‘হেয়ার সেল’ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ছবি : সংগৃহীত
ইয়ারবাড কীভাবে কানের ক্ষতি করতে পারে?
ইয়ারবাড ব্যবহারের ঝুঁকি শুধু শব্দ কতটা জোরে বাজছে, তার ওপর নির্ভর করে না। কত সময় ধরে এবং কত ঘন ঘন সেই শব্দ কানে পৌঁছাচ্ছে, সেটির ওপরও নির্ভর করে।
ইয়ারবাড কানের পর্দার খুব কাছাকাছি অবস্থান করে। ফলে, বাইরের স্পিকারের তুলনায় একই ভলিউমের শব্দ সরাসরি কানের ভেতরে বেশি তীব্রভাবে পৌঁছাতে পারে।
দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ শব্দ শুনলে অন্তঃকর্ণের ভেতরের ক্ষুদ্র ‘হেয়ার সেল’ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শব্দ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এই কোষগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একবার এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে, সাধারণত আর পুনরুজ্জীবিত হয় না। ফলে, ধীরে ধীরে শ্রবণশক্তি কমে যেতে পারে।
এছাড়া, ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটানা মাঝারি ভলিউমেও ইয়ারবাড ব্যবহার করলে ক্ষতি হতে পারে। কেননা, সেক্ষেত্রে কান পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ পায় না। এতে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
দীর্ঘদিন ইয়ারবাড ব্যবহারে কানে খৈল বা ইয়ারওয়াক্স জমে যেতে পারে। এতে শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও, কান বন্ধ লাগা কিংবা কম শোনার মতো অনুভূতি হতে পারে।
২০২২ সালে কিউরিয়াসে প্রকাশিত একটি সাহিত্য পর্যালোচনায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ২৩টি গবেষণা বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে ইয়ারফোন ও হেডফোন ব্যবহারের সঙ্গে শব্দজনিত শ্রবণশক্তি হ্রাসের সম্ভাব্য সম্পর্ক পর্যালোচনা করা হয়েছিল।
গবেষণাগুলোতে দেখা যায়, ব্যক্তিগত মিউজিক প্লেয়ারের শব্দের মাত্রা ৭৮ থেকে ১৩৬ ডেসিবেল পর্যন্ত উঠতে পারে। এত উচ্চ মাত্রার শব্দ দীর্ঘ সময় কানে পৌঁছালে, শ্রবণশক্তির ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
একটানা মাঝারি ভলিউমেও ইয়ারবাড ব্যবহার করলে ক্ষতি হতে পারে। ছবি : সংগৃহীত
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিক্ষার্থী প্রতিদিন ২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ইয়ারফোন ব্যবহার করত, তাদের মধ্যে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার হার কম ব্যবহারকারীদের তুলনায় বেশি ছিল।
অন্য একটি গবেষণায় দেখা যায়, কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে হেডফোনে উচ্চ শব্দ শোনায় অভ্যস্ত কিশোরদের শ্রবণসংক্রান্ত সমস্যার ঝুঁকি ৪ গুণেরও বেশি হতে পারে।
দিনে কতক্ষণ ইয়ারবাড ব্যবহার করা নিরাপদ?
সবার জন্য প্রতিদিন কতক্ষণ ইয়ারবাড ব্যবহার করা যাবে- এর নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। কারণ ঝুঁকি নির্ভর করে শব্দের মাত্রা, ব্যবহারের সময় এবং কত ঘন ঘন ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর।
তবে, শ্রবণস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো ‘৬০/৬০ নিয়ম’। অর্থাৎ, যেখানে ভলিউম সর্বোচ্চের প্রায় ৬০ শতাংশে রাখা হয় এবং মাঝে বিরতিসহ একবারে প্রায় ৬০ মিনিটের বেশি একটানা শোনা উচিত নয়।
সারাদিন একটানা ইয়ারবাড কানে লাগিয়ে রাখার পরিবর্তে ব্যবহারের মাঝে নিয়মিত বিরতি নেওয়া এবং মোট ব্যবহারের সময় সীমিত রাখা নিরাপদ।
২০২৫ সালে জার্নাল অফ অডিওলজি অ্যান্ড অটোলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণাতেও দেখা গেছে, যারা একটানা ১ ঘণ্টার বেশি সময় ইয়ারফোন ব্যবহার করেন, তাদের মধ্যে ইয়ারফোন সম্পর্কিত কানের সংক্রমণের প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।