রাতে দেরি করে খাবার খাওয়ার অভ্যাসকে অনেকেই স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ মনে করেন। কিন্তু গবেষণা বলছে, খাবারের সময়ও শরীরের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে ঘুমানোর কাছাকাছি সময়ে রাতের খাবার খেলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হতে পারে, ক্ষুধা বাড়তে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে ওজন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
শরীরের নিজস্ব জৈবিক ঘড়ি দিনের বিভিন্ন সময়ে খাবার হজম ও বিপাকের ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে একই খাবার দিনের বেলায় খেলে শরীর যেভাবে তা প্রক্রিয়াজাত করে, রাতে দেরিতে খেলে একইভাবে করতে পারে না।
স্পেনে প্রচলিত একটি কথা হলো, ‘রাজা হয়ে সকালের নাশতা করুন, রাজপুত্রের মতো দুপুরের খাবার খান এবং গরিবের মতো রাতের খাবার খান।’ দেশটিতে দুপুরের খাবার সাধারণত দিনের সবচেয়ে বড় খাবার। রাতে অনেকেই হালকা খাবার খান। কেউ কেউ শুধু ফল ও দই খেয়েও থাকেন।
খাবারের সময় শরীরের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে স্পেনের মুরসিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মার্তা গারাউলেত বিষয়টি নিয়ে আগ্রহী হন। একই খাবার ও একই ধরনের জীবনযাপন অনুসরণ করেও মানুষের ওজন কমার ক্ষেত্রে পার্থক্য কেন হচ্ছে, তা খুঁজতে গিয়ে তিনি খাবারের সময়ের গুরুত্ব দেখতে পান।
৪২০ জন প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে ২০ সপ্তাহের একটি ওজন কমানোর কর্মসূচিতে দেখা যায়, যারা দিনের তুলনামূলক আগে দুপুরের খাবার খেয়েছেন, তারা পরে খাওয়া ব্যক্তিদের চেয়ে বেশি ও দ্রুত ওজন কমিয়েছেন।
আরেকটি গবেষণায় একই ধরনের খাবার খাওয়া সুস্থ নারীদের মধ্যে দেখা যায়, যারা দেরিতে দুপুরের খাবার খেয়েছেন, তাদের রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক খারাপ ছিল এবং শরীর কম পরিমাণে শর্করা পোড়িয়েছে।
দেরিতে খাওয়ার প্রভাব রক্তে শর্করার ওপরও স্পষ্ট। ২০২২ সালের এক গবেষণায় ৮০০ জনের বেশি প্রাপ্তবয়স্ককে শর্করাজাতীয় পানীয় দেওয়া হয়। দেখা যায়, ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে এটি গ্রহণ করলে চার ঘণ্টা আগে গ্রহণের তুলনায় শরীর তা কম দক্ষতার সঙ্গে প্রক্রিয়াজাত করে। তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি ছিল এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণকারী ইনসুলিনের নিঃসরণও কম ছিল।
এর পেছনে মেলাটোনিন হরমোনের ভূমিকা রয়েছে বলে গবেষকদের ধারণা। রাতে ঘুমের প্রস্তুতির সময় শরীরে মেলাটোনিনের মাত্রা বাড়তে থাকে। এ সময় খাবার গ্রহণ করলে শরীরের জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে খাবারের সময়ের একটি অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে।
দেরিতে খাবার খাওয়ার প্রভাব শুধু রক্তে শর্করায় সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, রাতে দেরিতে খেলে পরদিন ক্ষুধা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পেট ভরা থাকার সংকেত দেওয়া হরমোন লেপটিনের মাত্রা কমে যেতে পারে। ফলে বেশি খাবার খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
দেরিতে খাওয়ার সময় শরীর চর্বি পোড়ানোর বদলে তা জমিয়ে রাখার দিকেও বেশি ঝুঁকতে পারে। দীর্ঘদিন এমন অভ্যাস চললে ওজন নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। যাদের বংশগতভাবে ওজন বাড়ার ঝুঁকি বেশি, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
খাবারের সময় হৃদ্স্বাস্থ্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত। ফ্রান্সে এক লাখের বেশি মানুষকে নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দেরিতে সকালের খাবার খেতেন, তাদের হৃদ্রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি ছিল। সন্ধ্যার খাবার আগে খেয়ে রাতের খাবার ও সকালের নাশতার মধ্যে দীর্ঘ বিরতি রাখার সঙ্গেও ভালো হৃদ্স্বাস্থ্যের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে সবার শরীরের জৈবিক ঘড়ি এক নয়। কেউ সকালে বেশি সক্রিয়, আবার কেউ রাতে বেশি সক্রিয় থাকেন। এই স্বাভাবিক পার্থক্যও খাবারের সময় ও শরীরের প্রতিক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে। যারা রাতে বেশি সক্রিয়, তাদের ক্ষেত্রে দেরিতে খাবার খাওয়ার প্রবণতা বেশি হতে পারে এবং এতে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ ও ওজনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা বাড়ে।
ঘুমের সময় ও মানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ক্ষুধা ও খাবারের আকাঙ্ক্ষা বেড়ে যেতে পারে। তখন বেশি ক্যালরি ও চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে ওজন বাড়াতে পারে।
তাই খাবারের সময় নিয়ে খুব কঠোর নিয়মের প্রয়োজন না হলেও কিছু অভ্যাস উপকারী হতে পারে। প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে খাবার খাওয়া, দিনের প্রথম ভাগে শস্য, ডাল, ফল ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার বেশি রাখা এবং রাতে তুলনামূলক হালকা খাবার খাওয়া ভালো। রাতের খাবারে মাছ, মুরগি, বাদাম ও বীজের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঘুমানোর অন্তত তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করার চেষ্টা করা। নির্দিষ্ট কোনো সময়কে সবার জন্য রাতের খাবারের ‘সেরা সময়’ বলা না গেলেও, ঘুমের ঠিক আগে ভারী খাবার খাওয়ার অভ্যাস শরীরের জন্য ভালো নয়।
অর্থাৎ সুস্থ থাকার বিষয়টি শুধু প্লেটে কী আছে, তার ওপর নির্ভর করে না। কখন সেই খাবার খাচ্ছেন, সেটিও শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সময়ের আলো/এমকে