জীবনে প্রতিদিনই আমাদের অসংখ্য সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কোন কাজটি আগে করব, কোন সুযোগটি গ্রহণ করব, কোথায় ঝুঁকি নেব কিংবা কখন অপেক্ষা করব, এমন ছোট-বড় সিদ্ধান্তের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে ভবিষ্যৎ। কিন্তু ভাল সিদ্ধান্ত নেওয়া সব সময় সহজ নয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এ ক্ষেত্রে মানুষের চেয়ে কয়েকগুণ ছোট প্রাণীর কাছ থেকেও শেখার মতো অনেক কিছু আছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, পিঁপড়া, মৌমাছি, ঘাসফড়িং, তেলাপোকা ও ফলের মাছি সীমিত তথ্যের মধ্যেও পরিস্থিতি অনুযায়ী কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা এমন কিছু নীতি খুঁজে পেয়েছেন, যা মানুষের জীবন, ব্যবসা ও প্রযুক্তিতেও কাজে লাগানো সম্ভব।
পিঁপড়া শেখায়, সব বিকল্প যাচাই করে কার্যকর পথ বেছে নিতে হয়
খাবারের সন্ধানে পিঁপড়ারা শুরুতে একাধিক পথে ছড়িয়ে পড়ে। যে পথে খাবার পাওয়া যায়, সেখানে চলার সময় তারা ফেরোমোন নামের রাসায়নিক সংকেত রেখে যায়। সবচেয়ে ছোট ও কার্যকর পথে দ্রুত যাতায়াত হওয়ায় সেখানে বেশি ফেরোমোন জমে। ফলে অন্য পিঁপড়েরাও ধীরে ধীরে সেই পথ বেছে নেয়।
কোনো একটি পিঁপড়ে পুরো পরিস্থিতি না বুঝলেও পুরো দল মিলে সবচেয়ে কার্যকর পথ খুঁজে নেয়। এই আচরণ থেকেই ‘অ্যান্ট কলোনি অপটিমাইজেশন’ পদ্ধতির ধারণা এসেছে, যা পরিবহন, যোগাযোগ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় কার্যকর সমাধান খুঁজতে ব্যবহার করা হয়।
মৌমাছি শেখায়, একা সিদ্ধান্ত না নিয়ে মতামত শুনতে হয়
নতুন বাসা কোথায় বানানো হবে, সেই সিদ্ধান্তে মৌমাছিরা একাধিক সম্ভাব্য জায়গা যাচাই করে। ফিরে এসে তারা ‘ওয়্যাগল ড্যান্স’-এর মাধ্যমে অন্যদের তথ্য জানায়। নাচের ধরন থেকে জায়গাটির দূরত্ব, দিক ও মান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। পরে অন্য মৌমাছিরাও জায়গাটি যাচাই করে। শেষ পর্যন্ত পর্যাপ্ত সমর্থন পাওয়া জায়গাটিই দলের পছন্দ হয়।
মানুষের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে একাধিক মত শোনা এবং তথ্য যাচাই করা ভুলের ঝুঁকি কমাতে পারে।
ঘাসফড়িং শেখায়, কখনো থেমে যাওয়াও সিদ্ধান্তের অংশ
দলবদ্ধ ঘাসফড়িং কখনো একটি দিকে চলতে চলতে হঠাৎ থেমে যায়। কিছু সময় নিরপেক্ষ থাকার পর তারা আবার নতুন দিকে চলতে শুরু করতে পারে। গবেষণায় এ আচরণকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দেখা হয়েছে।
মানুষের ক্ষেত্রেও কোনো সিদ্ধান্তে আটকে গেলে সঙ্গে সঙ্গে পক্ষ নেওয়ার বদলে কিছুটা সময় নিয়ে পরিস্থিতি নতুন করে দেখা কার্যকর হতে পারে।
তেলাপোকা শেখায়, ভিন্ন মতের মূল্য আছে
সব সদস্য একই ধরনের আচরণ করলে একটি দল সব সময় সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তেলাপোকার মধ্যে কেউ বেশি অনুসন্ধানী, আবার কেউ দ্রুত নিরাপদ জায়গায় চলে যায়। এই ভিন্ন আচরণের সমন্বয় দলকে পরিস্থিতি অনুযায়ী ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
অর্থাৎ একটি দলের শক্তি শুধু একমত হওয়ার মধ্যে নয়, ভিন্ন মত ও ব্যক্তিত্বকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর মধ্যেও রয়েছে।
ফলের মাছি শেখায়, অনুভূতিকেও উপেক্ষা করা যায় না
ফলের মাছি দুটি গন্ধ বা খাবারের মধ্যে পার্থক্য কম হলে সিদ্ধান্ত নিতে বেশি সময় নেয়। খাবারের পুষ্টিমান ও স্বাদের মতো বিষয়ও তারা বিবেচনা করে। আবার ক্ষুধা বা চাপের মতো অভ্যন্তরীণ অবস্থাও তাদের আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
মানুষের সিদ্ধান্তেও যুক্তির পাশাপাশি ভয়, ক্ষুধা, চাপ, অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির প্রভাব থাকে। তাই ভাল সিদ্ধান্তের জন্য নিজের আবেগকে অস্বীকার না করে তার কারণ বোঝাও জরুরি।
ক্ষুদ্র এসব প্রাণীর আচরণ শেষ পর্যন্ত একটি বড় শিক্ষা দেয়। ভাল সিদ্ধান্তের জন্য সব সময় বিপুল তথ্য বা অসাধারণ বুদ্ধির প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন পরিস্থিতি বোঝা, বিকল্প যাচাই করা, অন্যের মতামত শোনা, ভিন্নতাকে গ্রহণ করা এবং প্রয়োজনে নিজের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার মানসিকতা।
সময়ের আলো/এমকে