যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে বারবার দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। কখনো খাদ্য, কখনো বিশুদ্ধ পানি, কখনো আটা ও রুটি, কখনো রান্না করা খাবার, আবার কখনো হাসপাতাল ও জরুরি মানবিক সহায়তা- হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (এইচসিএসবি) দীর্ঘ সময় ধরে গাজার মানুষের জন্য এভাবেই ধারাবাহিক কাজ করে যাচ্ছে।
গাজা সিটি, দেইর আল-বালাহ, খান ইউনিস, রাফাহ, আল-মাওয়াসি ও আল-কারারা- পরিস্থিতি ও প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকায় তাদের সহায়তা পৌঁছেছে।
এই কার্যক্রমকে আলাদা করে তুলেছে আরেকটি বিষয়- প্রমাণভিত্তিক ডকুমেন্টেশন। প্রতিটি প্রকল্পের দিন-তারিখ, স্থান, ছবি, ভিডিও এবং মাঠপর্যায়ের তথ্য সংরক্ষণ ও প্রকাশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দাতাদের কাছে কাজের বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
গাজার মতো যুদ্ধক্ষেত্রে যখন ছবি ও ভিডিওর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, পুরনো ছবি নতুন বলে প্রচারের অভিযোগ শোনা যায়, তখন সময়, স্থান ও বাস্তব মাঠপর্যায়ের প্রমাণ সামনে রাখা মানবিক কাজের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
৬ সরকারি হাসপাতালের স্বীকৃতি
এইচসিএসবি’র গাজা কার্যক্রমের উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে রয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ৬টি সরকারি হাসপাতাল থেকে লিখিত প্রশংসাপত্র ও স্বীকৃতি পাওয়া।
যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি অঞ্চলের সরকারি হাসপাতালগুলো থেকে বাংলাদেশি মানবিক প্রতিষ্ঠানের এমন স্বীকৃতি পাওয়া শুধু এইচসিএসবি’র নয়, বাংলাদেশের মানবিক উদ্যোগের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ।
এটি প্রমাণ করে, বাংলাদেশের মানুষের সহায়তা শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা হাসপাতাল, বাস্তুচ্যুত পরিবার ও যুদ্ধপীড়িত মানুষের কাছে বাস্তবে পৌঁছেছে।
আরব গণমাধ্যমেও বাংলাদেশের নাম
এইচসিএসবি’র মানবিক কার্যক্রম বিভিন্ন আরব ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও উঠে এসেছে।
আল জাজিরা, ফিলিস্তিন টিভি, সুদান ন্যাশনাল টিভি, আল জারকা টিভি, আল তাইবা টিভি এবং মিশরের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের নানা দিক প্রচারিত হয়েছে।
এ প্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের মানবিকতা, দানশীলতা ও যুদ্ধপীড়িত মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দৃশ্যমান হয়েছে।
একদিন নয়, ধারাবাহিক কাজ
গাজায় এইচসিএসবি’র কার্যক্রম কোনো একদিনের আয়োজন নয়। গাজা সিটি থেকে খান ইউনিস, রাফাহ থেকে আল-মাওয়াসি- বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন এলাকায় খাদ্য, পানি, আটা, রুটি, রান্না করা খাবার ও জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার একটি ধারাবাহিক রেকর্ড রয়েছে। এই ধারাবাহিকতাই প্রতিষ্ঠানটির কাজকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
বাংলাদেশেও বিস্তৃত মানবিক কার্যক্রম
গাজার পাশাপাশি বাংলাদেশেও এইচসিএসবি প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন, জীবিকাভিত্তিক সহায়তা, শিক্ষা, মক্তব, অন্ধ শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অসহায় পরিবারকে স্বাবলম্বী করার বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালনা করছে।
সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে অসহায় মানুষকে স্বাবলম্বী করতে প্রায় এক কোটি টাকার গবাদিপশু, সেলাই মেশিন, ভ্যান, ক্ষুদ্র ব্যবসার উপকরণসহ বিভিন্ন আয়মুখী সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
এই কার্যক্রমে দেশের আলেম-ওলামা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, স্বেচ্ছাসেবক এবং সাধারণ দাতাদের অংশগ্রহণ রয়েছে।
মানবিক কাজে আস্থার প্রশ্ন
মানুষ যখন নিজের কষ্টার্জিত অর্থ দান করেন, তখন তার প্রত্যাশা থাকে- সহায়তাটি যেন সত্যিই সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছায়। এক্ষেত্রে এইচসিএসবি দিন-তারিখ, স্থান, ছবি-ভিডিও, মাঠপর্যায়ের নথি এবং অডিটের ওপর গুরুত্ব দিয়ে একটি স্বচ্ছ ও প্রমাণভিত্তিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
মানবিক কাজ শুধু আবেগের বিষয় নয়, এটি আস্থারও বিষয়। সেই আস্থার ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা, ধারাবাহিকতা ও প্রমাণ। গাজার মাটিতে বাংলাদেশের পতাকা তাই এখন শুধু একটি দেশের পরিচয় বহন করছে না। এটি বহন করছে বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা, দায়িত্ব, আমানত এবং মজলুম মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার।
সময়ের আলো/মহু