রাজধানীর অভিজাত চার এলাকার ভবনগুলোর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে এসেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাম্প্রতিক পরিদর্শনে। মাত্র দুই মাসে গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকায় ৪ হাজার ৪০৯টি ভবন ও বাসা পরিদর্শন করেছে রাজউক। এর মধ্যে ২ হাজার ৮২২টি ভবনেই পাওয়া যায়নি সেপটিক ট্যাঙ্ক। অর্থাৎ পরিদর্শন করা প্রায় ৬৪ শতাংশ ভবনেই সেপটিক ট্যাঙ্ক নেই। এ ছাড়া সোক পিট আছে মাত্র ৩৪১টি ভবনে। অর্থাৎ ৪ হাজার ৬৮টিতে বা প্রায় ৯২ শতাংশ ভবনে সোক পিট নেই।
উল্লেখ্য সোকপিট হলো ভূগর্ভস্থ একটি বিশেষ গর্ত বা চেম্বার, যা সাধারণত রান্নাঘর, গোসলখানা বা সেপটিক ট্যাঙ্কের তরল বর্জ্য পানি নিষ্কাশনে ব্যবহার করা হয়। এর দেয়াল ছিদ্রযুক্ত বা খোলামেলা হয় এবং ভেতরে ইট, খোয়া বা বালু ভরা থাকে, যাতে বর্জ্য পানি ধীরে ধীরে মাটিতে চুইয়ে মিশে যেতে পারে।
রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সোক পিটের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় ভবনগুলোর বর্জ্য ড্রেন, নালা বা অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে লেক বা জলাধারে গিয়ে পড়ছে। আর এ কারণেই দীর্ঘদিন ধরে দূষিত হচ্ছে গুলশান লেকসহ আশপাশের জলাধার। অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী সেপটিক ট্যাঙ্ক ও সোকপিট না থাকা এবং কোথাও সরাসরি ড্রেন বা লেকে বর্জ্য নির্গমনের অভিযোগের পর এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে যায় সরকার।
সম্প্রতি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক উচ্চ পর্যায়ের সভায় এসব ভবনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে চারটি অভিজাত এলাকায় সব ভবনের ওপর বিশেষ জরিপ পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়। গুলশান লেকের পরিবেশগত অবস্থা, দূষণের উৎস এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে গত ২১ মে অনুষ্ঠিত সভায় জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী গত ১৯ ও ২০ মে গুলশান লেকের উন্নয়ন বিষয়ে যে নির্দেশনা প্রদান করেছেন, তা বাস্তবায়নে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সভায় গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকার সব ভবনের স্যুয়ারেজ লাইন যথাযথভাবে সেপটিক ট্যাঙ্ক ও সোক পিটের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়।
রাজউক, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা ওয়াসা এবং স্থানীয় সোসাইটির প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটিকে এক মাসের মধ্যে জরিপ কাজ সম্পন্ন করতে বলা হয়েছিল। যেসব ভবনে রাজউকের অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী সেপটিক ট্যাঙ্ক বা সোক পিট পাওয়া যাবে না, তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি অবৈধ সংযোগগুলো বিচ্ছিন্ন করা হবে বলেও সভায় সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজউকের নকশা সঠিকভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না তা তদারকি করতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবের (প্রশাসন অধিশাখা-১) নেতৃত্বে একটি মনিটরিং টিম গঠন করা হয়। সভার সিদ্ধান্তের আলোকেই গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকার ভবনগুলোর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিয়ে পরিদর্শন শুরু হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে গুলশান লেকের পানি দূষণ বাড়ছে। বর্ষা মৌসুমে লেকের পানি কালচে হয়ে যাওয়া, দুর্গন্ধ সৃষ্টি, জলজ প্রাণীর মৃত্যু এবং পানির মানের অবনতি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীরা বারবার অভিযোগ জানিয়ে আসছেন। বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত পরিবেশগত পর্যবেক্ষণেও লেকে জৈব দূষণের মাত্রা স্বাভাবিক সীমার চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। সবচেয়ে পরিকল্পিত ও অভিজাত আবাসিক এসব এলাকায় ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ রাজউকের সাম্প্রতিক পরিদর্শনে বিপুলসংখ্যক ভবনে সেপটিক ট্যাঙ্ক ও সোক পিট না থাকার তথ্য সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে ভবন অনুমোদনের সময় এসব ব্যবস্থা যাচাই করা হয়েছিল কি না। ভবন নির্মাণের পর নিয়মিত তদারকি হয়েছে কি না, তাও এখন খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, যেসব ভবনে ওয়াসার স্যুয়ারেজ সংযোগ নেই, তাদের জন্য আইনগত ও কারিগরি দিক বিবেচনা করে সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে। কার্যকর সেপটিক ট্যাঙ্ক থাকাকে একটি বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো পরিবেশ রক্ষা করে একটি বাস্তবসম্মত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বুয়েটসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হবে এবং তাদের সুপারিশের ভিত্তিতেই পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে