দীর্ঘদিন সমুদ্রে থাকার চাপ, দুর্বিষহ জীবনযাপন এবং বারবার দায়িত্বের মেয়াদ বাড়ায় চরম মানসিক চাপে পড়েছেন মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নাবিক ও মেরিন সদস্যরা। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে উঠেছে যে, জাহাজের কয়েকজন সদস্য সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন বলে তাদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও মেরিন সদস্য নিয়ে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন টানা প্রায় নয় মাস ধরে সমুদ্রে রয়েছে। এর মধ্যে রেকর্ড ২৫০ দিন ধরে জাহাজটি কোনো বন্দরে ভিড়তে পারেনি।
গত বৃহস্পতিবার সান দিয়েগোতে নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে প্রায় ২০০ পরিবারের সদস্য তাদের ক্ষোভ ও উদ্বেগের কথা জানান। তারা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন সমুদ্রে থাকার কারণে জাহাজের সদস্যদের মানসিক ও শারীরিক অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে।
এক নারী জানান, তার স্বামী সেদিন তাকে পাঠানো এক বার্তা বলেছিলেন, তিনি আশা করছেন, আগামীকাল যেন আর ঘুম থেকে না ওঠেন।
সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা
মিলিটারি টাইমসকে অ্যানাবেল লোমা নামে এক নারী জানান, তার স্বামীকে বারবার বাড়তি সময় দায়িত্ব পালন করতে হওয়ায় তিনি ভেঙে পড়েছিলেন। একপর্যায়ে তিনি জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেন।
লোমা বলেন, তার স্বামী নিজের চাকরি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় পাচ্ছেন। দীর্ঘ ১৩ বছরের সামরিক ক্যারিয়ার নষ্ট হয়ে যেতে পারে— এই আশঙ্কাও তাকে আরও মানসিক চাপে ফেলেছে।
আরেক নাবিকের স্ত্রী জানান, তার স্বামী এক সহকর্মীকে জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করতে দেখে তাকে ধরে ফেলেন এবং টেনে ডেকে ফিরিয়ে আনেন।
এসব ঘটনার পর নৌবাহিনীর সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২৫০ দিন ধরে সমুদ্রে
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন গত বছরের ২১ নভেম্বর সান দিয়েগো থেকে যাত্রা শুরু করে। প্রথমে জাহাজটির গন্তব্য ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল। কিন্তু ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জাহাজটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হয়।
এরপর থেকে নাবিকদের স্থলে নামার সুযোগ খুবই কমেছে। পাঁচ হাজারের বেশি নাবিক ও মেরিন সদস্যের মধ্যে মাত্র দুবার স্থলে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে— ডিসেম্বরে গুয়ামে এবং জুলাইয়ে ওমানে।
জাহাজটির দায়িত্ব মে মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ চলতে থাকায় কয়েক দফা দায়িত্বের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে এটি ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের পঞ্চম মাসে রয়েছে।
জাহাজের পরিবেশ বসবাসের অনুপযুক্ত
মানসিক চাপের পাশাপাশি জাহাজের ভেতরের জীবনযাপন নিয়েও নানা অভিযোগ উঠেছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য মাইক লেভিন নাবিকদের কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগ তুলে ধরেছেন। তার দাবি, জাহাজের অনেক ঝরনায় ছত্রাক ধরেছে, কিছু টয়লেট নষ্ট, লন্ড্রি মেশিন দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে না এবং অনেক সময় গরম পানিও পাওয়া যাচ্ছে না।
খাবার নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। কখনো কখনো নাবিকদের মাত্র আধা কাপ ভাত ও দুটি টর্টিলা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সাবান, ডিওডোরেন্ট ও টুথপেস্টের মতো প্রয়োজনীয় জিনিসেরও সংকট রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এপ্রিলেও জাহাজের খাবারের মান ও পরিমাণ নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল। তখন জাহাজে পানি সংকট, নোংরা ঝরনা ও নষ্ট লন্ড্রি মেশিনের কথাও সামনে আসে।
তবে সে সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এসব অভিযোগকে “ভুয়া খবর” বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
এখন কংগ্রেস সদস্য লেভিন বলছেন, দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করা নাবিকদের অন্তত প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, এই নারী-পুরুষেরা দেশের সেবা করছেন। তাদের অন্তত গরম পানি, ব্যবহারযোগ্য টয়লেট ও পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া সরকারের দায়িত্ব।
দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও টানা সমুদ্রযাত্রার কারণে নাবিকদের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা এখন মার্কিন নৌবাহিনীর জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ