সিরিয়ার একটি গোপন স্থাপনায় সংরক্ষিত পারমাণবিক পদার্থ সরিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করেছে দামেস্ক। চুক্তির আওতায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এসব পদার্থ ফিরিয়ে নেবে। ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও সিরিয়ার সঙ্গে সমঝোতার পর এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের খবরে বলা হয়েছে, সংবেদনশীল ওই স্থাপনাকে ঘিরে ইসরায়েল, সিরিয়া এবং সম্ভাব্যভাবে তুরস্ককে জড়িয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও আইএইএ কয়েক মাস ধরে কূটনৈতিকভাবে কাজ করেছে। কয়েক সপ্তাহ আগে বিষয়টির সমাধান হলেও পুরো ঘটনাটি এতদিন গোপন রাখা হয়েছিল।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, ঘটনাটি সিরিয়ার নতুন সরকারের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কার্যকারিতা দেখায়। তাদের মতে, ওই সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র একটি সম্ভাব্য সংকট নিরসনে সক্ষম হয়েছে।
সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকার গোপনে একটি পারমাণবিক কর্মসূচি পরিচালনা করছিল। এর কেন্দ্র ছিল গোপন আল-কিবার রিঅ্যাক্টর। ২০০৭ সালে ইসরায়েল ওই রিঅ্যাক্টরে বোমা হামলা চালানোর পর সিরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি মূলত ধ্বংস হয়ে যায়।
তবে কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি গবেষণা, উন্নয়ন ও সংরক্ষণস্থল টিকে ছিল এবং সেগুলোর বেশিরভাগই নিষ্ক্রিয় অবস্থায় ছিল।
আসাদ সরকারের পতনের পর আইএইএ নতুন সিরীয় সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। এর আওতায় সংস্থাটি আল-কিবার রিঅ্যাক্টরসহ সিরিয়ার অতীত পারমাণবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকটি স্থাপনা পরিদর্শনের অনুমতি পায়।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের রেসিডেন্ট ফেলো চার্লস লিস্টার বলেন, আসাদ সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সংবেদনশীল বিষয়গুলো, যার মধ্যে পারমাণবিক ও রাসায়নিক অস্ত্রসংক্রান্ত বিষয়ও রয়েছে, সমাধান করতে সিরিয়ার নতুন সরকার আগ্রহী। এসব বিষয় দেশটির আন্তর্জাতিক অবস্থান পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ইসরায়েল গত দুই বছর ধরে যে স্থাপনাগুলোর ওপর নজর রাখছিল, তার একটি ছিল ‘সাইট ৯৯ ’, জানিয়েছেন দুই ইসরায়েলি কর্মকর্তা। তাদের মতে, আসাদ সরকার সেখানে আল-কিবার পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পারমাণবিক পদার্থ সংরক্ষণ করেছিল।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ওই পদার্থের মধ্যে ছিল ‘ইয়েলোকেক’, যা ইউরেনিয়াম আকরিক থেকে তৈরি এক ধরনের গুঁড়া এবং পরে আরও প্রক্রিয়াজাত করে পারমাণবিক জ্বালানি চক্রের অংশ হিসেবে সমৃদ্ধ করা যেতে পারে।
আল-কিবার স্থাপনা থেকে পাওয়া অন্যান্য অবশিষ্টাংশ ও ‘বর্জ্য’ও সাইট ৯৯-এ রাখা হয়েছিল বলে জানান ওই কর্মকর্তা। তবে ওই পদার্থ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য নয়।
কর্মকর্তাদের মতে, এগুলো ‘ডার্টি বোমা’ তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ধরনের প্রচলিত বিস্ফোরক পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটায় না; বরং তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে দিয়ে কোনো এলাকা দূষিত করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানান, আসাদ সরকারের পতনের পরপরই ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) সাইটটির প্রবেশপথে বোমা হামলা চালায়, যাতে কেউ সেখানে প্রবেশ করতে না পারে। সাইটটি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, তা নিয়ে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা করছিল বলে জানান এক মার্কিন কর্মকর্তা। হোয়াইট হাউসের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছিলেন।
এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন, ওই স্থাপনায় পারমাণবিক পদার্থ থাকা ইসরায়েল কোনোভাবেই মেনে নেবে না বলে ট্রাম্প প্রশাসনকে জানানো হয়েছিল। পারমাণবিক পদার্থ সরিয়ে না নেওয়া হলে, অথবা সিরিয়া ওই পদার্থে প্রবেশের চেষ্টা করছে এমন কোনো লক্ষণ দেখা গেলে, ইসরায়েল সাইটটিতে আবার হামলা চালানোর হুমকিও দিয়েছিল বলে জানান ইসরায়েলি কর্মকর্তারা।
তবে একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ইসরায়েল উদ্বিগ্ন থাকলেও কোনো সময়ই তারা সাইটটিতে হামলা চালানোর একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে যায়নি। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একমত হয় যে, সিরীয় সরকারের সম্মতি নিয়ে পদার্থগুলো সরিয়ে নেওয়াই হবে সবচেয়ে ভালো পন্থা, জানান ওই মার্কিন কর্মকর্তা।
ট্রাম্প প্রশাসন বিষয়টি সিরীয় সরকারের কাছে তুললে বর্তমান সিরীয় সরকারের কর্মকর্তারা জানান, সাইটটিতে পারমাণবিক পদার্থ থাকার বিষয়টি তারা জানতেন না বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও সিরিয়ায় খুব অল্পসংখ্যক মানুষ এ বিষয়ে জানতেন।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আসাদ-পরবর্তী সিরীয় সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র একটি কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। তিনি বলেন, আমরা যখন কোনো বিষয়ে সিরীয়দের সঙ্গে কাজ করি, তারা ভালো অংশীদার।
তবে কয়েক সপ্তাহ আগে সাইটটি পর্যবেক্ষণরত ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এলাকায় কিছু গতিবিধি শনাক্ত করেন। এতে তাদের সন্দেহ হয়, নতুন সিরীয় সরকার আগের সমঝোতা থেকে সরে এসে সাইটে থাকা পারমাণবিক পদার্থে প্রবেশের চেষ্টা করছে।
ইসরায়েলি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইসরায়েলের এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল যে তুরস্ক সিরীয় সরকারকে ওই পদার্থের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করছে। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ইসরায়েলিরা সব সময় বিভিন্ন বিষয় যাচাই করে দেখে, সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না নিশ্চিত করে। তারা এটা করছে, সেটি ভালো।
এর ফল হিসেবে তিন সপ্তাহ আগে আইএইএ ও সিরীয় সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী সাইট ৯৯ থেকে পারমাণবিক পদার্থ সরিয়ে নেওয়া হবে। হোয়াইট হাউস, আইএইএ এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, সাইট ৯৯ নিয়ে কার্যক্রম এখনো চলছে এবং পারমাণবিক পদার্থ এখনও সরানো হয়নি। ওই মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, আমরা মনে করি, সবাই এই ফলাফলে সন্তুষ্ট। আশা করছি, খুব শিগগিরই অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারব এবং বছরের শেষ হওয়ার আগেই এটি শেষ করতে পারব।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ