কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর উদ্ধার অভিযান এখন ‘শেষ পর্যায়ে’ পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন দেশটির কর্মকর্তারা। সোমবারের ভয়াবহ ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৬৫ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ৩ হাজার ৫০০ জনের বেশি।
বুধবার (১২ আগস্ট) উদ্ধারকারীরা ভূমিকম্পের পর প্রায় ৭২ ঘণ্টার গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমার কাছাকাছি পৌঁছান। সাধারণত ভূমিকম্পের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত মানুষ পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।
৭ দশমিক ৪ মাত্রার এই ভূমিকম্পটি চলতি শতকে কলম্বিয়ায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। স্থানীয় কর্মকর্তাদের হিসাবে, এখনো প্রায় ৫০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ধ্বংস হয়েছে ৯ হাজার ৫৫০টির বেশি বাড়ি।
দেশটির কফি অঞ্চলের শহর পেরেইরায় ৮৩ জন এবং তৃতীয় বৃহত্তম শহর ক্যালিতে ৭৪ জন মারা গেছেন।
ক্যালির মেয়র আলেহান্দ্রো এদের বুধবার বলেন, আমরা এখন উদ্ধার অভিযানের শেষ পর্যায়ে প্রবেশ করছি। এর পরেও কেউ জীবিত পাওয়া যাবে না, এমন নয়। তবে তখন কাজটি আরও কঠিন হবে।
ধ্বংস হওয়া হাসপাতাল-স্কুল পুনর্নির্মাণে জরুরি তহবিল
ভূমিকম্পে ধ্বংস হওয়া হাসপাতাল, স্কুল, বাড়ি ও অন্যান্য অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে একটি জরুরি তহবিল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা।
ভূমিকম্পের মাত্র তিন দিন আগে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া দে লা এসপ্রিয়েলা বলেন, এটি নিঃসন্দেহে ভয়াবহ মাত্রার একটি ভূমিকম্প। আমাদের মূল লক্ষ্য এখন যারা নিখোঁজ রয়েছেন, তাঁদের খুঁজে বের করা।
ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় তিনি অর্থনৈতিক জরুরিও ঘোষণা করেছেন। তবে এর আওতায় কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা বিস্তারিত জানাননি।
ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত থাকার আশা
পেরেইরায় একটি ধসে পড়া বেকারির ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকারীরা বিশেষভাবে কাজ করছেন। তাদের ধারণা, সোমবারের ভূমিকম্পের পর থেকে সেখানে আটকে থাকা এক ভ্রাম্যমাণ খাবার বিক্রেতা এখনো জীবিত থাকতে পারেন।
কম্পন শনাক্ত করার বিশেষ যন্ত্র দিয়ে উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে সম্ভাব্য নড়াচড়ার সংকেত পেয়েছেন। খবর পেয়ে তার স্বজনেরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন।
ধ্বংসস্তুপের নিচে আটকে থাকা ব্যক্তির ভাতিজি ১৬ বছর বয়সী সারাহ লোয়াইজা বলেন, তারা বলেছে, সম্ভবত তিনিই। আমার মনে হচ্ছে, আমার বুক ফেটে যাবে।
স্বজনদের দাবি, উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা ওই ব্যক্তিকে দুবার এবং পরে তিনবার শব্দ করতে বললে তিনি সাড়া দেওয়ার চেষ্টা করেন।
ক্যালিতেও তৃতীয় রাতের মতো উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। খালি হাতে ধ্বংসাবশেষ সরানোর পাশাপাশি ক্রেন ও প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহার করা হচ্ছে। মাঝে মাঝে সবাইকে কাজ থামিয়ে নীরব থাকতে বলা হচ্ছে, যাতে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে কারও আওয়াজ শোনা যায়।
স্বেচ্ছাসেবী উদ্ধারকর্মী জোহানা সানচেজ বলেন, প্রতি আধা ঘণ্টা পর আমরা সবাইকে চুপ থাকতে বলি, যাতে জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়। এখন পর্যন্ত তিনজনকে জীবিত এবং তিনজনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
উদ্ধারকাজ আরও গোছানো হয়েছে
ক্যালির টোরেস দেল লিমোনার এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারাও উদ্ধারকাজে যোগ দিয়েছেন। সেনাসদস্য, সরকারি কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা মিলে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের খুঁজছেন।
বোগোতার ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা কামিলো কানো বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়ার পর উদ্ধারকাজ আরও সহজ হয়েছে। এতে ভিড় ও শব্দ কমেছে। ফলে ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ নড়াচড়া করছে কি না, তা শনাক্ত করা সহজ হচ্ছে।
অন্যদিকে, এই ভূমিকম্পকে নতুন প্রেসিডেন্ট দে লা এসপ্রিয়েলার জন্য বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। কারণ নির্বাচনের আগে তিনি সরকারি খরচ কমানোর পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবেলার সরকারি সংস্থার বাজেট কমানোর কথা বলেছিলেন।
লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল নিয়ে কাজ করা সংস্থার বিশ্লেষক তিজিয়ানো ব্রেদা বলেন, এই ভূমিকম্পই নতুন প্রেসিডেন্টের জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা।
তিনি বলেন, যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার বাজেট কমানোর পরিকল্পনা ছিল, ভূমিকম্পের পর এখন সেই সংস্থাই উদ্ধার ও ত্রাণকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সূত্র : আল-জাজিরা
সময়ের আলো/ইউএমএইচ