ভারতের প্রায় ১০০ কোটি ভোটারের তথ্য যাচাই ও ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছে বিরোধী দল ও বিভিন্ন সংগঠন।
অভিযোগকারীদের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর সর্বশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। ২০২৪ সালের সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে প্রায় ৬৫ কোটি মানুষ ভোট দিয়েছিলেন।
তবে নির্বাচন কমিশন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং সরকারের মন্ত্রীরা ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি
জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিতর্ক আরও জোরালো হয় গত সপ্তাহে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি প্রতিবেদনের পর। সংবাদপত্রটির দাবি, নির্বাচন কমিশনের কার্যত দুই উপপ্রধান গত ১০ মাসে ভোটার তালিকা, ভোটার নিবন্ধন পদ্ধতি এবং কমিশনের ডিজিটাল ব্যবস্থাসংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অন্তত ১৪টি আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছিলেন।
তবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ভিন্নমত বা পর্যবেক্ষণ থাকা স্বাভাবিক। জ্ঞানেশ কুমার ও অপর দুই নির্বাচন কমিশনার এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি।
দেশজুড়ে বিক্ষোভের হুমকি
জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টি শুক্রবার দেশব্যাপী বিক্ষোভের হুমকি দিয়েছে। সংগঠনটি তাকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেছে।
অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
জ্ঞানেশ কুমার অবশ্য নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরে গত বছর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, নির্বাচন কমিশনের কাছে ‘বিরোধী বা ক্ষমতাসীন পক্ষ বলে কিছু নেই; সবাই সমান’।
ট্রাম্পের প্রশংসার পরই নতুন বিতর্ক
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জ্ঞানেশ কুমারের প্রশংসা করেছিলেন। ভারতের ভোটারদের ছবি-সংবলিত পরিচয়পত্র দিয়ে নিজেদের পরিচয় প্রমাণের নিয়মের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভোটব্যবস্থার তুলনা করে তিনি ভারতের ব্যবস্থাকে ইতিবাচকভাবে উল্লেখ করেন।
এর কিছুদিন পরেই ভোটার তালিকা নিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে সমালোচনা আরও বাড়ে। উত্তর ভারতের তার পৈতৃক বাড়ির কাছাকাছি এলাকায় তাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়ে দেয়াল লিখনের ঘটনাও ঘটে।
কে এই জ্ঞানেশ কুমার?
৬২ বছর বয়সী জ্ঞানেশ কুমার ১৯৮৮ সালে ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবা (IAS)-তে যোগ দেন। উত্তরপ্রদেশের নিজ রাজ্যের একটি সরকারি কলেজ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বি.টেক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি প্রশাসনে কর্মজীবন শুরু করেন।
তিনি ভারতের প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর একই বছরের মার্চে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান। পরে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে বিরোধী সংসদ সদস্যরা তাকে পদ থেকে সরানোর জন্য সংসদে একটি প্রস্তাবও আনেন। তবে সেটি সংসদে প্রত্যাখ্যাত হয়।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ