তুরস্কে গত জুলাইয়ে ন্যাটো সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোথায় অবস্থান করছিলেন, এমনকি ভবনের কোন তলায় ছিলেন— সেটিও ইরান জানত বলে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। একই সময়ে সম্মেলনের আশপাশে কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র হাতে এক ব্যক্তিকে শনাক্ত করেছিল মার্কিন গোয়েন্দারা।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়েছে, ৮ জুলাই তুরস্কে সম্মেলনের শেষ দিনে ট্রাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক গোয়েন্দা তথ্য হাতে আসে যুক্তরাষ্ট্রের।
এসব তথ্যের মধ্যে এয়ার ফোর্স ওয়ানকে লক্ষ্য করে নির্দিষ্ট একটি ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকিও ছিল। ট্রাম্প যে বিমানে থাকবেন, সেটিই সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়। একই সময়ে ন্যাটো সম্মেলনের কাছাকাছি এলাকায় কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র হাতে একজনকে দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় ছিল ইরানি গোয়েন্দাদের তথ্যের নির্ভুলতা। ট্রাম্প আঙ্কারায় যে ভবনে অবস্থান করছিলেন, সেই ভবনের নির্দিষ্ট তলা সম্পর্কেও ইরান অবগত ছিল বলে জানা গেছে। এসব তথ্যকে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য মনে করেই ট্রাম্পের গতিবিধি গোপন রাখা এবং তাকে তুরস্ক থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য অস্বাভাবিক একটি পরিকল্পনা করে মার্কিন নিরাপত্তা বাহিনী।
ট্রাম্পকে নিরাপদে তুরস্ক থেকে সরিয়ে নিতে মার্কিন কর্মকর্তাদের হাতে ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টা। যৌথ বাহিনীর প্রধান জেনারেল ড্যান কেইন হুমকির মাত্রা নির্ধারণ ও পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানকে ‘ডিকয়’ বা বিভ্রান্তিমূলক বিমান হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে ট্রাম্প ওই পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠেন। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘পুরোনো দিনের কথা মনে করে’ তিনি এই বিমানেই যাবেন। কিন্তু বাস্তবে ওই বিমানে তুরস্ক ছাড়েননি তিনি।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, গোপনে ট্রাম্পকে বিমান থেকে নামিয়ে বিমানবন্দরের একটি ক্যাটারিং কনটেইনারের আড়ালে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে তাঁকে সি-৩২এ নামে একটি ছোট সামরিক বিমানে তোলা হয়। বিমানটি বোয়িং ৭৫৭-এর সামরিক সংস্করণ। এরপর ওই ছোট বিমানটি গোপনে ট্রাম্পকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে যায়। অন্যদিকে সাংবাদিক, হোয়াইট হাউসের কর্মী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান আলাদাভাবে তুরস্ক ছাড়ে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পুরো পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতেন এবং ডিকয় বিমানে ট্রাম্পের পরিবর্তে যাত্রা করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পরও নিরাপত্তা কৌশল অব্যাহত থাকে। ট্রাম্পকে বহনকারী সি-৩২এ প্রথমে আরএএফ মিলডেনহলে অবতরণ করে। পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান সেখানে পৌঁছানোর পর ট্রাম্পকে গোপনে আবার ওই বিমানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর অন্য একটি প্রবেশপথ দিয়ে তাকে এয়ার ফোর্স ওয়ানে তোলা হয়। পরে সাংবাদিকদের সামনে ট্রাম্প ওই বিমান থেকে বের হয়ে আসেন। এতে মনে হয়, তিনি তুরস্ক থেকে পুরো পথ ওই বিমানেই এসেছেন। পরে ট্রাম্প নিজেই জানান, নিরাপত্তার কারণে কর্মকর্তারা তাঁকে বিমান পরিবর্তন করতে বলেছিলেন।
তিনি বলেন, বিষয়টি পুরোপুরি সিক্রেট সার্ভিসের সিদ্ধান্ত এবং তিনি তাদের নির্দেশনা অনুসরণ করেছেন। নিরাপত্তার জন্য তাঁকে অন্য একটি বিমান ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান ট্রাম্প।
ইরানের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে হুমকি অবশ্য নতুন নয়। জো বাইডেনের প্রেসিডেন্ট থাকার সময়ও ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি কথিত হত্যার ষড়যন্ত্রের তথ্য সামনে এসেছিল। তবে তুরস্কের ঘটনার নতুন তথ্যগুলো দেখাচ্ছে, এবারের পরিস্থিতিকে মার্কিন কর্মকর্তারা কতটা গুরুতর হিসেবে দেখেছিলেন।
এটি শুধু ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সাধারণ কোনো হুমকি ছিল না। সম্ভাব্য ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার গোয়েন্দা তথ্য, সম্মেলনের কাছে কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র হাতে একজনের উপস্থিতি এবং ট্রাম্পের অবস্থান সম্পর্কে ইরানের অত্যন্ত নির্ভুল তথ্য— সব মিলিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্পের স্বাভাবিক বিমানযাত্রা বদলে যায় এক জটিল গোপন অভিযানে। এর মূল লক্ষ্য ছিল একটাই— ইরান যেন কোনোভাবেই জানতে না পারে, ট্রাম্প আসলে কোন বিমানে করে তুরস্ক ছাড়ছেন।
সময়ের আলো/কেএইচ