কখনো বিস্তীর্ণ আকাশজুড়ে সাদা মেঘের আস্তরণ। মুহূর্তেই আবার কালো মেঘে ভারী বৃষ্টি। এই রোদ-বৃষ্টির খেলার মধ্যেই ভোরের আলো ফুটতেই কাঁধে ধানের চারা, হাতে কোদাল আর চোখে নতুন স্বপ্ন নিয়ে মাঠে ছুটছেন কৃষকরা।
মৌলভীবাজারের কৃষি অধ্যুষিত কমলগঞ্জ উপজেলার মাঠগুলোতে এখন কৃষকদের প্রাণচঞ্চল পদচারণা। কাঁদা মাটিতে দাঁড়িয়ে একের পর এক ধানের চারা রোপণের দৃশ্য দেখে মনে হয়, যেন সবুজের বিশাল এক ক্যানভাস আঁকছেন তারা।
বর্ষার টানা বৃষ্টিতে জমিতে পর্যাপ্ত পানি থাকায় কৃষকদের মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নারী-পুরুষ কৃষি শ্রমিকদের ব্যস্ততায় মুখর হয়ে উঠেছে গ্রামের মাঠ। কোথাও বীজতলা থেকে চারা তোলা হচ্ছে, কোথাও সারিবদ্ধভাবে চলছে রোপণ। প্রকৃতি আর মানুষের পরিশ্রম মিলে লিখছে নতুন সম্ভাবনার গল্প।
গত আউশ মৌসুমে অনেক কৃষক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে চাষ করেছিলেন। কিন্তু ৮ জুন পাহাড়ি ঢলে ধলাই নদীর পানি বেড়ে ইসলামপুর ইউনিয়নের মখাবিলে প্রতিরক্ষা বাঁধের দুই স্থানে ভাঙনে বন্যা দেখা দেয়।
বন্যার পানিতে উপজেলার ৩০ হেক্টর আউশ ফসল, ৭০ হেক্টর বীজতলা ও ৫০ হেক্টর সবজি নষ্ট হয়। এতে প্রায় কোটি টাকার ক্ষতি হয়। কৃষকদের স্বপ্ন ভেসে যায় বানের পানিতে।
সেই ক্ষতি পেছনে ফেলে এখন আমন ধানই তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রধান অবলম্বন। কমলগঞ্জ পৌরসভা, সদর, আদমপুর, ইসলামপুর, মুন্সিবাজার, পতনউষার, রহিমপুর, শমসেরনগর, মাধবপুর ও আলীনগর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ জমিতে এখন দম ফেলার সময় নেই কৃষকদের।
সাজু মিয়া বলেন, প্রকৃতি অনেকটাই সহায় হয়েছে। সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় সেচের খরচ কমেছে। উৎপাদন ব্যয়ও কিছুটা কম হবে।
মরম আলী বলেন, প্রকৃতি সহায় হলেও সার, শ্রমিকের মজুরি ও কৃষি উপকরণের দাম নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে। তবে ভালো ফলনের আশায় ছেলেদের নিয়ে মাঠে কাজ করছি।
বুকভরা কষ্ট নিয়ে মোশারফ বলেন, ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে টমেটো চাষ করেছিলাম। বন্যায় সব ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। এই মাঠই আমাদের সবকিছু, তাই আবারও মাঠে নেমেছি।
কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. রকিবুল ইসলাম জানান, আমনের চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা ১৬ হাজার ৫৫৩ হেক্টর। এখনও আউশের ধান পুরোদমে কাটা শেষ হয়নি, তাই আমন রোপণ পুরোপুরি শুরু হয়নি।
তিনি আরও জানান, সরকারের কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় উপজেলার ৩ হাজার ৫০ জন কৃষককে ৫ কেজি ধান বীজ, ১০ কেজি ডিএপি ও ১০ কেজি এমওপি সার বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৭৯ হাজার ২৩৩ মেট্রিক টন আমন ধান উৎপাদনের আশা করছেন তিনি।
কৃষি বিভাগের আশাবাদের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন কৃষকরাও। তাদের বিশ্বাস, প্রকৃতি সহায় থাকলে এবং বড় ধরনের বন্যা বা রোগবালাই না হলে আমন মৌসুমে ভালো ফলন হবে।
আজ যে মাঠ কৃষকের ঘামে ভিজছে, কয়েক মাস পর সেই মাঠই ভরে উঠবে সোনালি ধানের শীষে। সেই সোনালি রংই হয়ে উঠবে কৃষকের হাসি, স্বপ্ন ও সাফল্যের প্রতীক।
সময়ের আলো/জোই