পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত তেঁতুলিয়া ও লোহালিয়া নদীর ভয়াবহ ভাঙনে ধুলিয়া, নাজিরপুর, কারখানা ও কাছিপাড়া ইউনিয়নের একের পর এক গ্রাম বিলীন হওয়ার পথে। বর্ষা ও জোয়ারের পানির তীব্র স্রোতে বসতভিটা, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাজার হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন নদীপাড়ের শত শত মানুষ।
কাছিপাড়া ইউনিয়নে কারখানা নদীর ভাঙনে যেকোনো সময় বিলীন হয়ে যেতে পারে তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে চররঘুনাথদ্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নদীর তীর থেকে বিদ্যালয়টির দূরত্ব এখন মাত্র ২০ থেকে ২৫ ফুট। এছাড়া হিসাজাত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পশ্চিম কাছিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিদ্যালয় দুটির দূরত্ব নদীর তীর থেকে যথাক্রমে ৭০ থেকে ৮০ ফুট।
স্থানীয়দের দাবি, গত কয়েক বছরে নদী যেভাবে ভাঙছে, তাতে বিদ্যালয়গুলোর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পশ্চিম কাছিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের প্রায় ৫০ ফুট জায়গা গত এক মাসেই নদীতে বিলীন হয়েছে।
বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নোমান বলেন, নদীভাঙনের কারণে বিদ্যালয়টি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। দ্রুত বিদ্যালয় রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
কাছিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুনীল চন্দ্র দাস বলেন, বিদ্যালয়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। গত বছর বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন কিছুটা ঠেকানো হলেও প্রায় এক মাস আগে আবার ৫০ ফুট জায়গা ভেঙে গেছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বিদ্যালয়ের পাশাপাশি একটি মসজিদ ও বাজারও হুমকির মুখে পড়বে। বিদ্যালয়টি সরিয়ে নেওয়ার মতো আশপাশে কোনো জায়গা নেই বলেও জানান তিনি।
এদিকে তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙনে ধুলিয়ার আয়তনও ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। ধুলিয়া লঞ্চঘাট, স্থানীয় লঞ্চঘাট বাজার, হাজারো একর ফসলি জমি ও শত শত বসতবাড়ি ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে সাইক্লোন শেল্টার ও একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ভাঙন রোধে টেকসই বেড়িবাঁধ ও সেতু নির্মাণের দাবিতে ধুলিয়ায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মানববন্ধন হয়েছে। ইউএনও সালেহ আহমেদ ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করে টেকসই ব্লক দিয়ে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
তেঁতুলিয়া নদীর তীব্র স্রোতে নাজিরপুর ইউনিয়নের বড় ডালিমা, নিমদী, কচুয়া ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের বসতভিটা, আবাদি জমি ও স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এরই মধ্যে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কাঁচা-পাকা সড়ক ও বসতভিটা নদীতে চলে গেছে। ভিটেমাটি হারিয়ে বহু পরিবার অন্যত্র চলে যাচ্ছে।
সম্প্রতি নাজিরপুর ইউনিয়নের ধানদী পয়েন্টসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সময়ে এসব এলাকা পরিদর্শন করেছেন। ইউএনও সালেহ আহমেদ ও স্থানীয় সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদও এলাকা পরিদর্শন করে টেকসই বাঁধ নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন।
নদীভাঙনে যোগাযোগব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। একের পর এক বসতঘর নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় অনেক পরিবার খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
ভাঙনকবলিত মানুষের অভিযোগ, বছরের পর বছর জিও ব্যাগ ফেলা ও অস্থায়ী প্রতিরক্ষার আশ্বাস দেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। স্থায়ী সিসি ব্লক বাঁধ নির্মাণের দাবিতে তারা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন। দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ না হলে এসব এলাকা বাউফলের মানচিত্র থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শাহানেওয়াজ তালুকদার বলেন, নদীভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভাঙনকবলিত এলাকায় বার্জের মাধ্যমে বালুর বস্তা ফেলা হবে। এতে বস্তাগুলো পরিকল্পিতভাবে একটির ওপর আরেকটি বসানো সম্ভব হবে এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে বেশি স্থায়ী হবে।
সময়ের আলো/এনএন