ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরীগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। এরই মধ্যে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ বিমানবাহী রণতরীও সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আপাতত কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরী থাকবে না।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাচ্ছে। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে মোতায়েন থাকা ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে প্রতিস্থাপন করবে এটি।
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে লিংকনের মোতায়েনের সময় এরই মধ্যে মূল পরিকল্পনার চেয়ে বাড়ানো হয়েছে। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থানের কারণে জাহাজটির নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর অনুপস্থিতি সাময়িক হতে পারে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি রণতরী সেখানে পাঠাতে পারে। তবে এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইরানকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান মার্কিন নৌবাহিনীর ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন রণতরীর অনুপস্থিতি চীন কাজে লাগাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা। হাডসন ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ব্রায়ান ক্লার্ক বলেন, এ সুযোগে চীন নিজেদের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করতে পারে।
তাঁর মতে, চীন ফিলিপাইন, জাপান, ইন্দোনেশিয়াসহ আঞ্চলিক দেশগুলোকে বোঝাতে চাইতে পারে যে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো প্রভাবশালী নয় এবং তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়ার সক্ষমতাও কমে গেছে।
চীনের সামরিক তৎপরতাও সম্প্রতি বেড়েছে। চলতি সপ্তাহে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে নৌ মহড়া করেছে বেইজিং। এ ছাড়া দক্ষিণ চীন সাগরের স্কারবরো শোলের কাছে সামরিক মহড়া চালিয়েছে চীনা বাহিনী। জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ ওকিনোটোরির কাছেও গত মাসে চীনের একটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার লাইভ-ফায়ার মহড়া চালায়।
চীনের সঙ্গে আঞ্চলিক ও ভূখণ্ডগত বিরোধ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের দুই গুরুত্বপূর্ণ মিত্র জাপান ও ফিলিপাইনের।
এশিয়া থেকে বিমানবাহী রণতরী সরিয়ে নেওয়ায় মার্কিন মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে ওয়াশিংটন তাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ফ্র্যাঙ্ক ব্র্যাডলি বৃহস্পতিবার ম্যানিলায় ফিলিপাইনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি জানান, দুই দেশের যৌথ সামরিক মহড়া বাড়াতে মার্কিন বিশেষ বাহিনী প্রস্তুত।
ব্র্যাডলি বলেন, বিশ্বজুড়ে যেকোনো জায়গায় শক্তি প্রয়োগের সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পর প্রয়োজন অনুযায়ী আবারও বাহিনী পুনর্বিন্যাস করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে সামরিক অভিযানে বিমানবাহী রণতরীর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেছেন। ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ডও ১১ মাসের দীর্ঘ মোতায়েন শেষে গত মে মাসে দেশে ফিরেছে। এটি ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের মোতায়েন ছিল।
অন্যদিকে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন টানা ২৪০ দিনের বেশি সমুদ্রে অবস্থান করেছে, যা একটি রেকর্ড। দীর্ঘ সময় মোতায়েন থাকার কারণে জাহাজটির নাবিকদের কর্মপরিবেশ নিয়ে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
কেন্টাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় নিরাপত্তা ও কূটনীতি বিষয়ক অধ্যাপক রবার্ট ফার্লি বলেন, যুদ্ধজাহাজ ও এর নাবিকদের সক্ষমতারও সীমা রয়েছে। দীর্ঘ সময় বিশ্রাম ছাড়া কাজ করলে নাবিকদের মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতা কমে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীতে বর্তমানে ১১টি বিমানবাহী রণতরী রয়েছে। সাধারণত এর মধ্যে দুটি বা তিনটি একসঙ্গে মোতায়েন থাকে। তবে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্টও সান দিয়েগো থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা হলে একসঙ্গে চারটি রণতরী মোতায়েন হতে পারে।
তবে এতে ভবিষ্যতে রক্ষণাবেক্ষণের চাপ বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রে বিমানবাহী রণতরী মেরামতের জন্য মাত্র দুটি প্রধান শিপইয়ার্ড রয়েছে। ফলে একাধিক রণতরীর রক্ষণাবেক্ষণ একসঙ্গে করতে গিয়ে বড় ধরনের জট তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এর ফলে আগামী কয়েক বছর যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরীর উপস্থিতি আগের তুলনায় কমে যেতে পারে।
এদিকে আধুনিক যুদ্ধে বিমানবাহী রণতরীর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের গবেষক মাইকেল সোয়াইন বলেন, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নতির কারণে চীনের মতো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বড় রণতরী এখন আগের চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
তাঁর মতে, ছোট যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন দিয়েও এমন অনেক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা সম্ভব, যেগুলোতে বিমানবাহী রণতরী থেকে যুদ্ধবিমান পাঠাতে হয়।
মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারাও বড় রণতরীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল ড্যারিল কডল ছোট ও আধুনিক যুদ্ধজাহাজসহ অন্যান্য সামরিক সম্পদ ব্যবহারের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।
সময়ের আলো/কেএইচ