বিপুল জনআকাক্সক্ষা আর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নকে সামনে রেখে দায়িত্ব নেওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হলো আজ। শপথ নেওয়ার পরে ঘোষিত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার সময়সীমাও শেষ।
এই ছয় মাসে সরকার কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তনের বার্তা দিতে পেরেছে, প্রধানমন্ত্রীর সাদাসিধে জীবনযাপন, সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন, কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য নতুন উদ্যোগ, বিরোধী দলের সঙ্গে রাজনৈতিক সৌহার্দ এবং কূটনীতিতে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা সব মহলেই প্রশংসা কুড়িয়েছে।
কিন্তু একই সময়ে প্রশাসনকে পেশাদার ও নিরপেক্ষ করার প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, আইনশৃঙ্খলায় কাক্সিক্ষত স্বস্তি কেন ফেরেনি, জ্বালানি সংকটে শিল্প খাতের উদ্বেগ কেন কাটছে না এবং মন্ত্রিসভার সবাই কেন প্রধানমন্ত্রীর গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না এসব প্রশ্নও সামনে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ছয় মাসে একটি নির্বাচিত সরকারকে চূড়ান্ত বিচারের সময় এখনও আসেনি। তবে সরকারের হানিমুন পিরিয়ড শেষ হওয়ায় মানুষের চোখ এখন প্রতিশ্রুতির চেয়ে ফলাফলের দিকেই বেশি নিবদ্ধ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণ শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার ধরনেও পরিবর্তন চেয়েছিল। সেই পরিবর্তনের প্রথম ছয় মাসে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা গেলেও প্রশাসন, অর্থনীতি ও জনসেবার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পুরোনো সমস্যার ছায়া এখনও কাটেনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথের মধ্য দিয়ে শুরু হয় নতুন সরকারের পথচলা। একই অনুষ্ঠানে ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন। প্রধানমন্ত্রীসহ ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই সরকারের কাছে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী মানুষের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় দৃশ্যমান পরিবর্তন।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী নিজে সরেজমিন বিভিন্ন কার্যক্রম পরিদর্শন, তুলনামূলকভাবে সাদাসিধে জীবনযাপন, সরকারি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে আলাদা ভাবমূর্তি তৈরি করতে পেরেছেন। ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড, কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফ, খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক নীতির মতো উদ্যোগও ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী প্রথম বিদেশ সফর মুসলিম দেশ মালয়েশিয়ায় করার পরে প্রতিবেশী চীন সফর করেছেন। গুমের শিকার পরিবারগুলোর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ, রাজধানীসহ সব শহরের যানজট নিরসনে প্রযুক্তিনির্ভর এআই ট্রাফিক পদ্ধতি চালু ও রাজধানীর আন্তঃবাস টার্মিনাল শহরের বাইরে স্থানান্তরের উদ্যোগ গ্রহণ, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিষয়টিও সরকারের সফলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া সরকারি ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর কিছু উদ্যোগ প্রশংসা পেয়েছে। খাবার খরচ কমানোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের লাগাম টানার চেষ্টা হয়েছে। তবে কোথাও সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বাস্তবায়নে পিছিয়ে আসার ঘটনা সরকারের ব্যয়সংকোচন নীতির ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা, প্রশাসনে পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে বিতর্ক, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাবের অভিযোগ, মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সড়কে অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা ও পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলাও কমেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পশ্চিমা দেশগুলোর গুড গভর্ন্যান্সের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশে প্রয়োগের চেষ্টা করছেন। কিন্তু মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না।
তার মতে, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া অনেক নির্দেশনার যথাযথ বাস্তবায়ন দৃশ্যমান নয়। মানুষের প্রত্যাশা পূরণে মন্ত্রীদের পাশাপাশি আমলাদের কর্মকাণ্ডের দিকেও প্রধানমন্ত্রীর আরও নজর দেওয়া দরকার। সংসদ সদস্যদের আয়করমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং কৃষকদের ঋণ সুদসহ মওকুফের উদ্যোগকে গুণগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন তিনি।
তার মতে, গণঅভ্যুত্থানের আগের বাংলাদেশ এবং পরের বাংলাদেশ এক নয়। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় দলীয় সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারের ছয় মাসে অর্থনীতিতে স্বস্তি পুরোপুরি ফেরেনি। সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে জনপ্রশাসন নিয়ে। গণঅভ্যুত্থানের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল একটি দল নিরপেক্ষ, দক্ষ ও পেশাদার প্রশাসন গড়ে উঠবে। কিন্তু নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং কর্মকর্তাদের ওএসডি করে রাখার মতো পুরোনো ধারাই অনেক ক্ষেত্রে অব্যাহত রয়েছে।
প্রথম বড় পদোন্নতিতেই অবসরপ্রাপ্ত ও বিতর্কিত কর্মকর্তার নাম আসা, বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিয়ে আবার তা বাতিল করা, জেলা প্রশাসক বদলি ও নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন এবং বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তাকে প্রশাসনিক দায়িত্বের বাইরে রাখার ঘটনা আলোচনায় এসেছে। এসব ঘটনায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
গত ছয় মাসে প্রশাসনের বড় পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৭৯ জন উপসচিবকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি, বিভিন্ন পর্যায়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা আগের সরকারের কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া এবং ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালন করা ৩২ জন সাবেক জেলা প্রশাসককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো।
কর্মকর্তাদের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েও শেষ পর্যন্ত সরকার পিছু হটেছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন সচিবসহ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া সিনিয়র সচিব, সচিব ও সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা রয়েছেন ২২ জন।
এর বাইরে গত ২৩ জুলাই নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিবসহ গ্রেড-২ পদমর্যাদার আরও ১২টি গুরুত্বপূর্ণ পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে প্রশাসন ক্যাডারের ৭১৪ কর্মকর্তা ওএসডি ও সংযুক্ত হিসেবে রয়েছেন। তাদের কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব না থাকলেও বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বাবদ প্রতি মাসে গড়ে সাড়ে ৫ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হচ্ছে। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি দীর্ঘ প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা দক্ষ জনবলকে কাজে না লাগানোর অভিযোগ উঠেছে।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী অবশ্য সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে সন্তুষ্ট। তার দাবি, সব ক্ষেত্রেই অগ্রগতি ভালো হয়েছে, কোথাও কোথাও অগ্রগতি শতভাগ। কেন্দ্র থেকে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত ন্যায়ভিত্তিক পদোন্নতি ও পদায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে।
তবে সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক মনে করেন, প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ এবং ন্যায়ভিত্তিক পদোন্নতি ও পদায়ন নিশ্চিত করতে সরকার এখনও সফল হয়নি। আগের আমলের কর্মকর্তারাই পদোন্নতিতে এগিয়ে থাকছেন- এমন পরিস্থিতিতে সরকার যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তাদের যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছে না।
তবে তার মতে, সরকারের জন্য ১৮০ দিন যথেষ্ট সময় নয়। বিদায়ি সরকার স্বাভাবিক কোনো সরকার ছিল না; ফলে নতুন সরকারের সামনে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যাও অনেক বেশি। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি কিছুটা কমেছে। তবে আরও কমাতে হবে। পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়ে অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করা জরুরি।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ মিয়া মনে করেন গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রশাসন সংস্কারের কথা জোরালোভাবে বলা হলেও কার্যকর সংস্কার হয়নি। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর জনপ্রত্যাশা ছিল দক্ষ, যোগ্য ও দল নিরপেক্ষদের নেতৃত্বে প্রশাসন পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিচালিত হবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশাও পূরণ হয়নি। তিনি বলেন, একটি দুষ্টচক্র পেছন থেকে প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করছে। এই চক্র আগের সরকারের সময়ও সক্রিয় ছিল। এখনও তারা বহাল থাকলে প্রশাসনের কাক্সিক্ষত সংস্কার সম্ভব হবে না।
সরকারের ছয় মাসে সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জনজীবন নিশ্চিত করা। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এখনও পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি। বিভিন্ন ধরনের অপরাধ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সড়কে বিশৃঙ্খলা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ রয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা, পরিবহন ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ফলে নাগরিক জীবনের ভোগান্তি কমাতে এসব খাতে দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপের দাবি রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের প্রাথমিক হানিমুন পিরিয়ড শেষে এখন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পালা। ছয় মাসে সরকারের কিছু উদ্যোগ ইতিবাচক বার্তা দিলেও এসব উদ্যোগের সুফল যদি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে দৃশ্যমান না হয়, তা হলে জনপ্রত্যাশা পূরণের দাবি দুর্বল হয়ে পড়বে।
বিশেষ করে প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, শিল্প ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় মাসে নির্বাচনি ইশতেহার ও ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী অধিকাংশ লক্ষ্যই পূরণ হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। কোথাও ১০০ শতাংশ, আবার কোথাও ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, প্রশাসনকে গুছিয়ে নেওয়া এবং বাস্তবায়ন করার জন্য মোটামুটি গুছিয়ে নিয়ে কাজগুলো করতে হচ্ছে। তাই পরবর্তী ছয় মাসে আরও জোরালোভাবে কর্মসূচিগুলো সফল বাস্তবায়ন হবে।
সময়ের আলো/এসএকে